এক দশকে সাত প্রধানমন্ত্রী, অস্থির ব্রিটেনের রাজনীতি

প্রকাশঃ Jul 20, 2026 - 19:47
এক দশকে সাত প্রধানমন্ত্রী, অস্থির ব্রিটেনের রাজনীতি


কেয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর সোমবার দায়িত্ব নেয় অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ফলে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ব্রিটেন।

ক্ষমতায় থাকাকালে কনজারভেটিভ পার্টির ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের সমালোচনা করেছিল লেবার পার্টি। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই তারাও নিজেদের জনসমর্থন হারানো নেতাকে সরিয়ে দিল।

লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

লেবার পার্টির প্রবীণ রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষ্যে দেওয়া ভাষণে এই প্রবণতার কথা স্বীকার করে বলবেন, স্থিতিশীল রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি ‘গভীরভাবে সচেতন।’

জরিপে জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া এবং নিজ দলের এমপিদের তৎপরতার পর গত জুনে স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পক্ষে লেবারের অধিকাংশ এমপি বার্নহ্যামকে সমর্থন দেন।

স্টারমার ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসেন। এর মধ্য দিয়ে টানা ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কনজারভেটিভদের আমলে বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের অস্থিরতার সমালোচনা করেন। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কনজারভেটিভরা মোট পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করেছিল। কিন্তু পররর্তীতে স্টারমারের নিজের দলও একই পথে হাঁটল।

২০১৬ সালের শুরু থেকে ব্রিটেনের সাত প্রধানমন্ত্রী :

ডেভিড ক্যামেরন (মে ২০১০-জুলাই ২০১৬): ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ব্রিটেনের সিদ্ধান্ত ক্যামেরনের দ্বিতীয় মেয়াদের অবসান ঘটায়।

২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ব্রিটেন ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দেয়। ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালানো ক্যামেরন এরপর পদত্যাগ করেন।

থেরেসা মে (জুলাই ২০১৬-জুলাই ২০১৯): ব্রেক্সিট গণভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

ব্রেক্সিট আলোচনা জোরালো করতে তিনি পরের বছর আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। তবে সেই সিদ্ধান্তের ফল উল্টো হয়। তার দল পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। 

সংসদে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৯ সালের মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভরা বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।

বরিস জনসন (জুলাই ২০১৯-সেপ্টেম্বর ২০২২): নিয়ম ভাঙাকে রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত করা বিতর্কিত রাজনীতিক বরিস জনসনকে দায়িত্ব পালনকালে করোনা মহামারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।

তিনি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভদের জয় এনে দেন।
তবে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে চাপে পড়েন জনসন। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের ধারাবাহিক পদত্যাগের পর তাকেও সরে দাঁড়াতে হয়।

লিজ ট্রাস (সেপ্টেম্বর ২০২২-অক্টোবর ২০২২) : লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এটিই ব্রিটিশ 

ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ড।

কর কমানোর বিতর্কিত ‘মিনি বাজেট’-এর কারণে তাকে পদ ছাড়তে হয়।

তার অর্থনৈতিক নীতিতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যুক্তরাজ্য আর্থিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এতে তিনি নিজ দলের সমর্থনও হারান।

ঋষি সুনাক (অক্টোবর ২০২২-জুলাই ২০২৪) : ঋষি সুনাক প্রায় ২০ মাস দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি স্টারমারের কাছে পরাজিত হন। এর মধ্য দিয়ে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

ট্রাসের সময়ের অস্থিরতার পর তিনি কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হন। তবে দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল থামাতে পারেননি।

ব্যক্তিগতভাবে ধনী এই সাবেক অর্থনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক খাতের পেশাজীবী শেষ পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে ধুঁকতে থাকা সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হন। 

কেয়ার স্টারমার (জুলাই ২০২৪-জুলাই ২০২৬) : ৬৩ বছর বয়সী স্টারমার ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

তবে দেশে তিনি কল্যাণমূলক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেন, যা পরে বামপন্থি আইনপ্রণেতাদের চাপে শিথিল করতে হয়। 

একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের মধ্যেই ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দেয়Ñএমন নীতিও গ্রহণ করেছিলেন। 

নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকের উত্থান মোকাবিলায় তিনি হিমশিম খান। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনেও লেবার পার্টিকে শোচনীয় পরাজয় হয়।

এ ছাড়া, প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের দূত হিসেবে নিয়োগ এবং পরে তাকে বরখাস্ত করায় স্টারমারের বিচারবোধ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এ ছাড়া জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ থাকা পিটার ম্যান্ডেলসনকে প্রথমে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের দূত হিসেবে নিয়োগ এবং পরে তাকে অপসারণের ঘটনায় স্টারমারের বিচারবোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে।