মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেলের দাম ও এআই বিনিয়োগ উদ্বেগে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধাক্কা

প্রকাশঃ Jul 24, 2026 - 21:19
মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেলের দাম ও এআই বিনিয়োগ উদ্বেগে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধাক্কা


মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের বিস্তার, অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ-এই তিন কারণে বিশ্ব শেয়ারবাজারে তৈরি হয়েছে এক চরম সংকট। এর প্রভাবে ওয়াল স্ট্রিটের বড় দরপতনের ধারাবাহিকতায় শুক্রবার এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধরণের পতন হয়েছে।

এর আগে কোনো একটি খাতের নেতিবাচক প্রভাব অন্য খাতের ইতিবাচক পরিস্থিতি দিয়ে সামাল দিতে পারতেন বিনিয়োগকারীরা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন একই সময়ে তিনটি বড় সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। হংকং থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিক্রির চাপ পড়েছে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর ওপর। কারণ, এআই–সংক্রান্ত হার্ডওয়্যার, কারখানা ও গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগের পর সেই অর্থ থেকে কবে মুনাফা মিলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

গত দুই বছরে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’-এর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট এবং টেসলার বিপুল মূলধনী ব্যয় নতুন করে আলোচনায় আসে। 

এতে অ্যালফাবেটের শেয়ার প্রায় ৭ শতাংশ এবং টেসলার শেয়ার ১৪ শতাংশের বেশি কমে যায়।

এর আগে মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন জানিয়েছিল, তারা চলতি বছরে এআই খাতে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে। আগামী সপ্তাহে কোম্পানিগুলো তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

বৃহস্পতিবার ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’-এর শেয়ারসূচক এপ্রিল ২০২৫ সালের শুল্ক–সংক্রান্ত অস্থিরতার পর এক দিনে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়ে। এতে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার কমে যায়।

সেন্ট জেমস প্লেস এশিয়া অ্যান্ড মিডল ইস্টের অ্যাঞ্জেলিনা লাই বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুলনামূলকভাবে অল্প কয়েকটি কোম্পানি বাজারের মুনাফার বড় অংশ এনে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশা বাড়ছে এবং বাজার আরও বাছাই করে বিনিয়োগ করছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু কোনো একটি খাতে বিনিয়োগ করাই যথেষ্ট হবে না। বরং কোন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকে টেকসই আয় ও মূলধনের আকর্ষণীয় মুনাফায় রূপ দিতে পারবে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করবে।’

ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিক্রির প্রভাব এশিয়ার বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় দরপতনে সিউলের বাজার ৩ শতাংশের বেশি নেমে যায়। স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৭ শতাংশের বেশি কমে।

টোকিওর নিক্কেই সূচকও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। কিওক্সিয়ার শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ, অ্যাডভানটেস্টের ৫ শতাংশের বেশি এবং টোকিও ইলেকট্রনের প্রায় ৭ শতাংশ কমে যায়।

হংকং, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর, তাইপে ও ম্যানিলার বাজারও উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে আসে।

-শুল্ক ইস্যুও ফিরেছে আলোচনায়-

এআই খাতের উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা। এতে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াবেÑএমন আশঙ্কাও কমে গিয়েছিল।

কিন্তু নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৭ শতাংশ বেড়ে আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। শুক্রবার প্রধান দুই ধরণের তেলের দাম সামান্য কমলেও ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপরেই ছিল।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি অকল্পনীয় এক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।’

এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের স্টিফেন ইনেস বলেন, ‘তেল, সুদের হার এবং এআই এখন মিলিত হয়ে আধুনিক বাজারের এক দানবে পরিণত হয়েছে। তেলের দাম মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। বন্ডবাজার সেই চাপকে উচ্চ মুনাফায় রূপ দিচ্ছে। আর প্রযুক্তি খাত বুঝতে পারছে, মূলধনের ব্যয় বেড়ে গেলে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির গল্পও ধাক্কা খেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘যা আগে তিনটি আলাদা ঝুঁকি মনে হয়েছিল, এখন তা একসঙ্গে একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।’

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বৃহস্পতিবারের আরেকটি ঘোষণা। এতে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে উদ্বেগের কারণে চীন ও ভারতসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করবে ওয়াশিংটন।