রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান শামা ওবায়েদের

প্রকাশঃ Sep 6, 2026 - 19:08
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান শামা ওবায়েদের


মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার আওতায় রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। 

তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়াটি যেন আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার জটিলতায় আটকে না থাকে।  বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে আমাদের যাচাই কাজ দ্রুত করতে হবে।’

আজ রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে দ্য ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপন্স স্ট্র্যাটেজিস’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে মূল প্রত্যাবাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বাংলাদেশ।

তিনি ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা এবং ২০১৭ সাল থেকে রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ধরে রাখা, মানবিক সহায়তা জোরদার করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ার কারণে মানবিক দায়িত্ব অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করে যাবে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় এ দায়িত্ব অব্যাহত রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, তাই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষায় সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানায় ঢাকা।

তবে প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, মানবিক সহায়তা এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা উচিত যাতে ক্যাম্পে দেওয়া সুবিধাগুলো যেন পরোক্ষভাবে আরও নতুন অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত না করে অথবা চূড়ান্ত প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে জটিল করে না তোলে।

শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির মধ্যেই টেকসই প্রত্যাবাসনের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন; প্রয়োজন অধিকার ও পরিচয়ের স্বীকৃতি। সেখানে রোহিঙ্গাদের আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। চলাফেরার স্বাধীনতা এবং জীবিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা যেন আবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় না ভোগেন, সেই আত্মবিশ্বাস তাদের দিতে হবে।

এ জন্য সংলাপ ও পারস্পরিক সমঝোতা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ, আসিয়ান, উন্নয়ন অংশীদার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে রাখাইন রাজ্যে আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানবিক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।

শামা ওবায়েদ ইসলাম  বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সাহায্য করবে এবং রাখাইনে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা ও স্থানীয় অধিবাসীÑউভয় পক্ষের উদ্বেগ নিরসন করবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাকে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাখতে হবে।

গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান প্রক্রিয়াসহ আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

শামা বলেন, ‘বিচার ও প্রত্যাবাসন আলাদা কোনো বিষয় নয়; জবাবদিহিতা এবং টেকসই প্রত্যাবর্তন একে অপরকে শক্তিশালী করে।’

তিনি বাংলাদেশের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ, জাতিসংঘের মাধ্যমে তৎপরতা বৃদ্ধি, আসিয়ানসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা, রাখাইনে মানবিক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং সংকটের মূল কারণ ও বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নজর বজায় রাখা।

তিনি বলেন, ‘তবে লক্ষ্য হতে হবে একটিই, রোহিঙ্গাদের যেন নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।’

শামা ওবায়েদ বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই চরম মানবিকতা, ধৈর্য ও কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিচয় দিয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে প্রত্যাবাসন সম্ভব।

তিনি বলেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন মানবিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসনের বাস্তব পদক্ষেপগুলোর একটি কার্যকর সমন্বয় ঘটানো।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন।

সংকট সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে শামা ‘দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতি থেকে সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন, সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে সংকট সমাধান এবং অনিশ্চয়তা থেকে আশার আলোয়’ উত্তরণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বিশেষ সম্মানীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।