বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে কিউবার পরিস্থিতি
কিউবায় ১০ দিনেরও কম সময়ে তৃতীয়বারের মতো দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর বুধবার ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি এ তথ্য জানিয়েছে। কমিউনিস্ট শাসিত দ্বীপ রাষ্ট্রটি এমনিতেই বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছিল। এর মধ্যেই গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেন। এতে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সীমিত জ্বালানির মজুত আরও কমে যায়। হাভানা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি ইউএনই জানায়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৫ মিনিটে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়। এতে ৯৬ লাখ মানুষের পুরো দেশ অন্ধকারে ডুবে যায়। মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও বুধবার ভোর ৪টা পর্যন্ত রাজধানী হাভানার মাত্র ২৪ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ ফিরে আসে বলে ইউএনই জানায়। ইউএনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে জানায়, ‘জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হচ্ছে।’
সংস্থাটি জানায়, একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটে সমস্যার কারণে হঠাৎ ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন হয়। এর ফলেই এ বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। জুলাইয়ের শুরু থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপটিতে এটি তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ বিপর্যয়। আর ২০২৬ সালের শুরু থেকে এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো এমন ঘটনা ঘটল। ৬২ বছর বয়সী গৃহিণী মারিয়া কারিদাদ আলভারেজ এএফপিকে বলেন, ‘আমার বলার মতো কোনো ভাষা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বিদ্যুৎ এসেছে। আমি কিছু শিম রান্না করলাম। পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি আবার বিদ্যুৎ নেই। মনে হচ্ছে, এর কোনো সমাধান নেই।’ তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট ‘মানুষের বেঁচে থাকার উৎসাহই কেড়ে নিচ্ছে।’ ৮২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ডেভিড মাতিয়াস রড্রিগেজ জানান, তার ফ্রিজে থাকা অল্প কিছু খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন।
গত সপ্তাহের উভয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর ৯৬ লাখ মানুষের পুরো দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। জ্বালানির সংকটের কারণে এ প্রক্রিয়া আরও ধীর ও জটিল হয়ে পড়ে। রাজধানী হাভানায় একটানা ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না। আর দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে বিদ্যুৎ ফিরতে কয়েক দিন লেগে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা আবর্জনার স্তূপে আগুন লাগিয়ে ও হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিউবা। গত জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছয় দশকের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে জ্বালানি অবরোধ আরোপ করার পর, পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইউএনই জানিয়েছে, জ্বালানির ঘাটতির কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জরুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটর ব্যবহারও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির মূল কারণ আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কারণে তা আরও খারাপ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’ লেভি আরও বলেন, জ্বালানির ‘সম্পূর্ণ অভাব’ রয়েছে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশও সরকার সংগ্রহ করতে পারছে না।
বছরের শুরু থেকে ওয়াশিংটন ও হাভানার সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে জানুয়ারির শুরুতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার বাড়ি থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে ফেডারেল অভিযোগের মুখোমুখি করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
ওয়াশিংটন কেবল একটি রুশ তেলবাহী জাহাজকে কিউবায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। মার্চে আসা ওই জাহাজে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল ছিল। সেই মজুতও ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
তেল অবরোধের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। এর ফলে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান দেশটিতে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
এ ছাড়া তিন দশক আগে দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগও এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত মাসের শেষ দিকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রড্রিগেজ বলেন, কয়েক মাস ধরে চলা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ‘কোনো অগ্রগতি’ হয়নি।