বিরোধীদের আপত্তি নাকচ, তড়িঘড়ি করে বিল পাস

প্রকাশঃ Jul 15, 2026 - 20:36
বিরোধীদের আপত্তি নাকচ, তড়িঘড়ি করে বিল পাস


বিলের ওপর কোনো আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। আজ বুধবার বিলটি সংসদে উত্থাপন করার পরপরই সেটা পাস করা হয়। তড়িঘড়ি করে সংসদে বিল আনা এবং সেটি পরীক্ষার জন্য স্থায়ী কমিটিতে না পাঠানো, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া, দ্রুততার সঙ্গে পাস করার কঠোর সমালোচনা করে বিরোধী দল।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিলটি পাস হয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক হলে গ্রহণ করা হবে। এটি নতুন কোনো আইন নয়। আজ সংসদ অধিবেশন শেষ হচ্ছে। তাই বিলটি পাস করতে হচ্ছে।

সংসদের বৈঠকের আজকের নির্ধারিত কার্যসূচিতে আইন প্রণয়নের কোনো বিষয় ছিল না। সম্পূরক কার্যসূচিতে এটি যোগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল সংসদে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সাধারণত বিল উত্থাপনের তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের নোটিশ দিতে হয়। বিল সংসদে উত্থাপনের পর সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে সেটি না করে বিলটি সরাসরি পাসেরও প্রস্তাব করতে পারেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী।

বিল উত্থাপনের আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদকে জানান, বিলের নোটিশের সময়ের বিষয়টি তিনি কন্ডন (মার্জনা) করেছেন।

কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, প্রশ্ন নাজিবুর রহমানের

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব করলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই আইনের মাধ্যমে ছয়টি পূর্ববর্তী আইনকে রহিত করা হচ্ছে। দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে।

স্পিকারের উদ্দেশে এই সংসদ সদস্য বলেন, তাঁরা আজ বিলের কপি পেয়েছেন। তিন দিনের বিষয়টা স্পিকার মার্জনা করেছেন; কিন্তু ৯ জুলাই এ আইনটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে। ছয় দিন চলে গেছে সংসদ সদস্যদের নোটিশ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট কেন দেওয়া হয়নি, এটা কমিটিতে না পাঠিয়ে সরাসরি পাস করার এত তাড়াহুড়া কেন—এসবের কোনো জাস্টিফিকেশন তাঁরা পাননি।

এখানে কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, এমন প্রশ্ন রেখে বিলটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন নাজিবুর রহমান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের বিষয়টি সপ্তম সংসদ থেকে শুরু হয়েছে। যে বিলটি আনা হয়েছে, এটা কোনো নতুন আইন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে ‘ওভারল্যাপিং’ হচ্ছে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। সেগুলো একটি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একীভূত করা হচ্ছে। 

আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি সংসদে আরও আগে আনতে পারলে তাঁরা খুশি হতেন। কিন্তু আজ অধিবেশন শেষ হবে। এই বিলটার মধ্যে জটিল কোনো বিষয় থাকলে তিনি নিজেই এটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতেন। তিনি আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চান।

তখন নাজিবুর রহমান ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাস করার অনুমতি দেন, তাহলে আমি মনে করি, আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রণেতা হিসেবে, সেটা আমাদের ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে।’

তবে তাঁর আপত্তি নাকচ হয়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। উত্থাপনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য প্রস্তাব করেন।

যুক্তিযুক্ত হলে সংশোধনী গৃহীত হবে

তখন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কয়েকটি ধারায় তাঁদের সংশোধনী আছে। সেটা কীভাবে দেবেন।

তখন ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় সদস্য যে ধারাগুলোতে সংশোধনের কথা বলছেন, এখন বিধি মোতাবেক যেহেতু আপনি সবকিছু কন্ডন করেছেন, তাঁরটাও কন্ডন করে মৌখিকভাবে উত্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। আমরা নোট করব এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যদি কোনো সংশোধনী গ্রহণ করার থাকে তাহলে পরে আমরা সেটা গ্রহণ করব, যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়।’

এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই অধিবেশনের আজকের শেষ দিন। আমরা চাই যে আমাদের এই দিনটা এই অধিবেশনের যেন গ্লোরিফাই হয়ে থাকুক। এখানে প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাস করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম, ভবিষ্যতে যেন সবকিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে। এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় স্যাক্রিফাইস করলাম; কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল।’ 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটা বিষয়কে তাড়াহুড়া করে অ্যাকোমোডেট করতে গিয়ে অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এটা এই সংসদের জন্য ভালো কোনো প্রেসিডেন্স হবে না।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ‘রাইটলি পয়েন্ট আউট’ করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে সদস্যরা যেসব ধারার মধ্যে সংশোধনী আনতে চান, সেটা নিয়ে এলে যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। আগামী অধিবেশনেও সেটা হতে পারে।

তখন স্বরাস্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মহান জাতীয় সংসদে আমরা প্রত্যাশা করছি সেই প্রতিশ্রুতি আপনি রক্ষা করবেন যৌক্তিকভাবে।

পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

বিলে যা আছে

পাস হওয়া বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনও এর মাধ্যমে রহিত করা হয়েছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ হবে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। চেয়ারম্যান হবেন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরকার নিয়োগ দেবে। কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হবে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশে বা বিদেশে শাখা কার্যালয় ও লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করা যাবে।