রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর রোডম্যাপের আহ্বান
দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারে রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
আজ রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেকাংশে রাসায়নিক পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কাঁচামালের আমদানি নির্ভরতা, উচ্চ শুল্ক, পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে এ খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বক্তারা বলেন, দেশের রাসায়নিক খাতের অভ্যন্তরীণ বাজার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হলেও অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাব, উচ্চ শুল্কহার, সরকারি সেবা ও লাইসেন্স প্রাপ্তির জটিলতা এবং লজিস্টিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় এ খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান।
মো. সলিম উল্লাহ বলেন, শিল্পনীতি সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নে আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান শিল্পনীতিতেই নতুন অধ্যায় সংযোজন যথেষ্ট হবেÑ এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সুপারিশ পেলে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান শিল্প ও শিক্ষাখাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিসিএসআইআরের গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি ও পণ্য শিল্প উদ্যোক্তাদের কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ এবং সহায়ক নীতির প্রয়োজন রয়েছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এস আর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী।
তিনি বলেন, দেশের রাসায়নিক খাতের বাজার ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এবং প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাসায়নিক আমদানি করেছে, যার বড় অংশ তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে উচ্চ শুল্ক, দুর্বল অবকাঠামো, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় এ খাতের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা রাসায়নিক শিল্পের জন্য বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, এপিআই শিল্পপার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা জানান, রাসায়নিক খাতে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে বিদ্যমান শুল্কহার ধীরে ধীরে কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে আনা হয়েছে, যার সুফল উদ্যোক্তারা শিগগিরই পাবেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক বলেন, শিল্পে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই), বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা), বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।