নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি

প্রকাশঃ Jan 31, 2026 - 21:10
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি


শাহরিয়ার আজিম

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলো যখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, অভিযোজন এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (COP31) সামনে রেখে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ, নীতি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ, ছাদভিত্তিক সোলার ব্যবস্থা, শিল্পখাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সবুজ অর্থায়ন সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ আরও বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার কারণে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সময়মতো পাওয়া গেলে স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম আরও দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে।

পরিবেশবিদদের ভাষ্য, নগরাঞ্চলেও জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। সবুজ উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ সুরক্ষাই নয়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশেও সহায়ক হতে পারে। সৌর প্যানেল, ব্যাটারি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে তরুণদের অংশগ্রহণও জলবায়ু কর্মসূচিতে ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও সক্রিয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি তুলে ধরা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন COP31 সম্মেলনে বাংলাদেশ অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে আরও কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানাতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা এবং জনগণের অংশগ্রহণ—এই চারটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কৌশল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখতে পারে।