পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতিবন্ধী ইয়াসির
শারীরিক অক্ষমতা লেখাপড়ার জীবনে কোনো বাধাঁ হতে পারে না, তা আবারও প্রমাণ করেছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার অদম্য তরুণ প্রতিবন্ধী ইয়াসির ইসলাম নিরব। জন্মের পর থেকে চার পাশের হাজারো প্রতিকূলতা আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সদ্য ঘোষিত এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সাফল্য জিপিএ-৫ অর্জন করেছে নিরব।
তার এই অবিশ্বাস্য সাফল্যে আনন্দে অশ্রু ঝরছে পরিবারে। নিরবের সাফল্যে গর্বিত পরিবার, বিদ্যালয় এবং উপজেলাবাসী। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েও দারিদ্রতার কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে অদম্য স্বপ্নবাজ তরুণ ইয়াসির ইসলাম নিরবের। এই শঙ্কায় তার সাফল্যের আনন্দ ক্ষণে ক্ষণেই মলিন হয়ে ধরা দিচ্ছে চোখে মুখে।
আজ বুধবার সকালে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী ইয়াসির ইসলাম নিরবের কাছে তার সাফল্যের গল্প জানতে চাইলে এই শঙ্কার কথা জানান তিনি। এ সময় নিরব তার পারিবারিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে জানান, আমার বাবা সিরাজুল ইসলাম একজন কৃষক, মা গৃহিণী। অল্প জমির চাষাবাদে চলছে আমাদের কষ্টের সংসার। পরিবারে আমি বড় সন্তান। আমার ছোট ২ বোনের মধ্যে ফারজানা আক্তার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। অপরজন ছোট সাদিয়া আক্তার। সে বর্তমানে শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। এরমধ্যে আমার উচ্চ শিক্ষার খরচ চালানো আমার দরিদ্র বাবা-মা’র জন্য অনেক কষ্টের।
এ সময় শিক্ষা জীবনের করুণ কষ্টের স্মৃতিচারণ করে ইয়াসির বলেন, প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় আমার বাবা আমাকে কোলে করে স্কুলে দিয়ে আসতো। এরপর মাধ্যমিকে পড়ার সময় কখনো আমার বাবা, কখনো আমার বন্ধুরা স্কুলে নিয়ে যেত। আজকে আমার সাফল্যের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। তবে আমার বাবা-মা’র মুখের হাসি আমাকে কষ্টের জীবনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। এখন আমার স্বপ্ন, আমি ডাক্তার হতে চাই।
উচ্চ শিক্ষার জন্য নিরব প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করে আরো বলেন, আমি লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চাই। ডাক্তার হয়ে আমার মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষদের পাশাপাশি দেশবাসীর সেবা করতে চাই। কিন্তু আমার বাবা-মা’র সামর্থ্য নেই আমাকে উচ্চ শিক্ষায় পড়ানোর। এই অবস্থায় শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন, দারিদ্রতার কারণে আমার লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। আমার স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, ডাক্তার হয়ে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।
জানা গেছে, জিপিএ-৫ শিক্ষার্থী ইয়াসির ইসলাম নিরব উপজেলার পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তার এই সাফল্যে খুশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম সায়ফুল ইসলাম বলেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিরব পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। অন্যদের চেয়ে তাকে কিছুটা বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেনি। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
সহপাঠী ও প্রতিবেশিরা জানান, শারীরিক কার্যক্ষমতার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কখনো কমেনি। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে নিরব। অনেক সময় শরীর তাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু মনের জোর আর স্বপ্ন তাকে এগিয়ে নিয়েছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করে নিরব এটাই প্রমাণ করেছে।
ইয়াসিরের বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ছেলেকে নিয়ে আমাদের সব সময়ই চিন্তা হতো। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ওকে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। কিন্তু ও কখনো হাল ছাড়েনি। আজ সে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের। কিন্তু ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। এই জন্য আমি একজন দরিদ্র পিতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চাই। আমার ছেলের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।