বিএসইসির কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামকে ঘিরে অভিযোগ, ঝুঁকিতে পুঁজিবাজার
বিগত সরকারের সহযোগীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও ব্রোকার হাউসগুলোকে হয়রানির অভিযোগ; সিসিএ উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও ট্রেড স্থগিত
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বাজার গোয়েন্দা ও তদন্ত এবং মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারি বিভাগের প্রধান ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কৃত্রিম ধস সৃষ্টি, ব্রোকার হাউস হয়রানি এবং অর্থ দাবির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রেখে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছেন এবং লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারীকে চরম লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন বলে বাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিতর্কিত অতীত ও আজ্ঞাবহ ভূমিকা অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং সাবেক কমিশনার তারিকুজ্জামানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের স্বার্থ রক্ষায় তিনি কমিশনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি বিএসইসির সাবেক কমিশনার তারিকুজ্জামানের সাথে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যান, যা সরকারি চাকরির বিধিমালা পরিপন্থী এবং তার একপেশে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ দেয়।
ব্রোকার হাউসে আতঙ্ক ও অনৈতিক সুবিধা দাবির অভিযোগ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শেয়ারবাজারে যখনই সূচকের ইতিবাচক মোড় বা স্বাভাবিক উত্থানের ইঙ্গিত দেখা যায়, তখনই ক্ষমতার অপব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করেন আনোয়ারুল ইসলাম। কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই বিভিন্ন ব্রোকার হাউসে বেআইনি চিঠি পাঠানো এবং ফোনে সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নির্দিষ্ট কিছু হাউসে কেন শেয়ার কেনাবেচা বেশি হচ্ছে—তা নিয়ে কারণ দর্শানো ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, হয়রানি থেকে বাঁচতে যেসব ব্রোকার হাউসের প্রতিনিধিরা তার সাথে দেখা করেন, তাদের কাছে তিনি মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ দাবি করেন। এই অনৈতিক অর্থ দাবির ক্ষেত্রে তিনি অর্থ উপদেষ্টা, অর্থমন্ত্রী, বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নাম ভাঙাচ্ছেন বলে ভুক্তভোগী ব্রোকার হাউসগুলো জানিয়েছে।
সালমান এফ রহমানের ঋণ ও প্রতিশোধমূলক তদন্ত অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিশাল অংকের বিনিয়োগ ও মার্জিন ঋণ হিসাব রয়েছে বেশ কিছু ব্রোকার হাউসে। বিগত ২০২৩ থেকে ২০২৬ মেয়াদে এসব হিসাবের মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের জন্য ব্রোকার হাউসগুলো থেকে তাগাদা দেওয়া হলে সালমান এফ রহমান ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীতে তার ইশারায় আনোয়ারুল ইসলাম নিজের প্রশাসনিক পদ ব্যবহার করে উক্ত ব্রোকার হাউসগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী ও হয়রানিমূলক তদন্ত শুরু করেন।
তদন্তের নামে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অসাধু সুবিধা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অযাচিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
আইন মেনেও ট্রেড স্থগিত, অনিশ্চয়তায় ১ লাখ বিনিয়োগকারী নিয়ম অনুযায়ী ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএলের যাবতীয় রেগুলেটরি ক্লিয়ারেন্স ও ফি প্রদান সাপেক্ষে লাইসেন্স রেনুয়ালের জন্য সমস্ত কাগজপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও ভুক্তভোগী ব্রোকার হাউসগুলোর ফাইল আটকে রাখা হয়েছে।
যেসব কোম্পানির কাস্টমার অ্যাকাউন্ট (CCA) উদ্বৃত্ত (Surplus) রয়েছে এবং স্টক রিকনসিলিয়েশন সম্পূর্ণ পরিষ্কার, তাদেরও ট্রেড স্থগিত করে রাখা হয়েছে। আনোয়ারুল ইসলামের এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে উক্ত ব্রোকার হাউসগুলোর সাথে যুক্ত প্রায় ১ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ব্যবহার করে বাজারকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং বর্তমান সরকারকে সামাজিকভাবে ও আর্থিকভাবে বিব্রত করতেই এই ধরনের অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। বিএসইসি থেকে অবিলম্বে এ ধরনের বিতর্কিত ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অপসারণ করে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা না করা হলে দেশের শেয়ারবাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।