কাস্টমস গোয়েন্দার অভিযানে বিমানের টয়লেট থেকে ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার
মোঃ তানভীর খান
যাত্রীর ব্যাগেজে নয়, এবার উড়োজাহাজের টয়লেটকে স্বর্ণ চোরাচালানের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগের সন্ধান পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (CIID)। সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের BG-585 ফ্লাইটে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে উড়োজাহাজের টয়লেটের ভেতর থেকে ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের দাবি, পূর্বপ্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ওই ফ্লাইটে শতাধিক স্বর্ণবার থাকার সম্ভাবনা ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর শুরু হয় বিশেষ তল্লাশি। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানের একপর্যায়ে উড়োজাহাজের টয়লেটের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণবারগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়।
উদ্ধার হওয়া ৫০টি স্বর্ণবারের প্রতিটির ওজন ১০ তোলা। সব মিলিয়ে স্বর্ণের ওজন দাঁড়ায় ৫০০ তোলা বা প্রায় ৫.৮৩২ কেজি। সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সিঙ্গাপুর থেকে ছেড়ে আসা BG-585 ফ্লাইটটি সোমবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ফ্লাইটটি অবতরণের আগেই সেখানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ থাকার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
তথ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বিমানটি অবতরণের পরপরই কর্মকর্তারা তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথম পর্যায়ে ফ্লাইটের বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানোর পর উড়োজাহাজের টয়লেটের ভেতরে সন্দেহজনকভাবে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। তবে গোয়েন্দা তথ্যে শতাধিক স্বর্ণবার থাকার কথা বলা হলেও তল্লাশিতে এ পর্যন্ত ৫০টি বার উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ কোনো যাত্রীর ব্যাগেজের ভেতর থেকে পাওয়া যায়নি। বরং উড়োজাহাজের টয়লেটের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় স্বর্ণবারগুলো উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এতে স্বর্ণগুলো কে বা কারা উড়োজাহাজের টয়লেটে রেখেছিল, কখন রেখেছিল এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থা এড়িয়ে সেগুলো কীভাবে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়েছিল, এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় তদন্তের আওতায় আসছে, স্বর্ণগুলো বিমানবন্দর থেকে বের করে নেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা চক্রকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল কি না। বিশেষ করে উড়োজাহাজে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখার সঙ্গে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কোনো সহযোগিতা ছিল কি না, থাকলে কারা এতে জড়িত, তাও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
অভিযানের আগে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যে ওই ফ্লাইটে ১০০টির বেশি স্বর্ণবার থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ তল্লাশির পর ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার হয়েছে। ফলে বাকি স্বর্ণবারের কোনো অস্তিত্ব রয়েছে কি না, থাকলে সেগুলো কোথায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এ বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, উদ্ধার করা ৫০টি স্বর্ণবারের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা গেলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্বর্ণের এই চালানের সঙ্গে কোনো যাত্রী সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না, নাকি উড়োজাহাজের কোনো নির্দিষ্ট অংশকে ব্যবহার করে চোরাচালানকারীরা স্বর্ণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে আসতে পারে, সিঙ্গাপুরে স্বর্ণগুলো কীভাবে উড়োজাহাজে উঠল, ঢাকায় পৌঁছানোর পর কার কাছে সেগুলো হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল এবং এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি কোনো সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র যুক্ত কি না।
উদ্ধার করা স্বর্ণের ওজন, প্রকৃত মূল্য, চালানের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রুটে স্বর্ণ চোরাচালানের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও শুল্ক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সাধারণত যাত্রীর ব্যাগেজ, শরীর বা ব্যক্তিগত সামগ্রীর মধ্যে স্বর্ণ লুকানোর ঘটনা সামনে এলেও এবার উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখার বিষয়টি নতুন করে নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালানের বড় চালান শনাক্ত ও জব্দের পাশাপাশি এর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উদ্ধার হওয়া ৫০টি স্বর্ণবার বর্তমানে আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চালানটির উৎস, সম্ভাব্য গন্তব্য এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে উদ্ধার হওয়া ৫০টি বারের মোট ওজন প্রায় ৫.৮৩২ কেজি এবং আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। তবে চূড়ান্ত ওজন ও মূল্য নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাচাই ও মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে।