জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশঃ Sep 22, 2026 - 21:12
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী


জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে জেলায় চা-শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যাতে মূল্যস্ফীতি না ঘটে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি না হয়, সে জন্য সরকার সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিতভাবে দাম সমন্বয় করায় মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের কাছে আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়।

তিনি বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে যেন অন্য পণ্যের ওপর প্রভাব না পড়ে, মূল্যস্ফীতি না ঘটে, সরবরাহ শৃঙ্খল যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও অসঙ্গতি তৈরি হলে তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। সরকার সেই বিষয়গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, দুই দিন আগেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমদানিকারক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে একটি বড় সভা হয়েছে। সেখানে পণ্য আমদানি, পরিবহন ও বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে যেখানে যেখানে অসঙ্গতি আছে, সেগুলোর ওপর আমরা দৃষ্টিপাত করছি। যাতে এসব অসঙ্গতি দূর করে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য অভিঘাতকে আমরা সামাল দিতে পারি, সে জন্য কাজ করছি।’ 

সম্প্রতি গ্যাসের সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকটও কেটে গেছে বলে জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এফএসআরইউতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছুদিন গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয়েছিল। সেই সমস্যা এখন আর নেই।

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় আমদানি করা বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেশে প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরেছে বলে জানান তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিনি ও সয়াবিনসহ যেসব আমদানি করা পণ্য দেশে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেসব কারখানা এখন পূর্ণ উদ্যমে কাজ করছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

তিনি বলেন, ‘ দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে এবং মূল্যের ওপর সেরকম লক্ষ্যণীয় কোনো অভিঘাত আসবে না ইনশাল্লাহ।’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিশ্বের অনেক দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে। সেসব দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম পরিবর্তিত হয়।

তিনি বলেন, ‘অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লে সেলফ ট্রিগারড হয়, নিজ দেশে মূল্যটা অটোমেটিক অ্যাডজাস্ট হয়। সকালে উঠে দেখবেন পেট্রোল পাম্পে মূল্য বেশি হয়ে গেছে।’

বাংলাদেশে সরকার জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে বলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের কাছে সরাসরি অনুভূত হয় বলে জানান তিনি।

এজন্য আমদানিকারক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

মুক্তাদির বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব এক খাত থেকে অন্য খাতে যেতে পারে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সরকার চায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হোক। সে লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে সিলেট সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সিএসআর তহবিলের সহযোগিতায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় কর্মরত চা-শ্রমিকদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহার স্বরূপ সুরক্ষা সামগ্রী হিসেবে বিভিন্ন চা বাগানের ১ হাজার ৯৮০ জন শ্রমিকের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ করা হয়।

এ সময় খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চা বাগান এলাকার দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট দ্রুত নিরসনে সরকার সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

চা শ্রমিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, সরকার চা বাগানের আয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে। চা বাগানকে লাভজনক করার জন্য কয়েকদিন আগেও আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বৈঠক করেছি।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেট সফরকালে সরজমিনে চা বাগান ঘুরে দেখেছেন। প্রচণ্ড বৃষ্টি ও কাদার মধ্যে চা শ্রমিক মা-বোন এবং ভাইদের কষ্ট করে কাজ করতে দেখে তিনি ব্যথিত হন। সেখান থেকেই তাঁদের সুরক্ষায় এই রেইনকোট বিতরণের চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাগানে আকস্মিক জটিল রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে ২-৩টি বাগান নিয়ে একটি করে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা যায়। 

তিনি বলেন, চা বাগানে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাব দূর করতে জাতীয় ভিত্তিতে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ (ইউএনও) স্থান নির্ধারণসহ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, আগামী দিন বাগানের আয় বাড়ানোর জন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি। চা গাছের স্বাস্থ্য নষ্ট না করে আরও কোন গাছ লাগানো যায় কী না সে ব্যাপারে আলাপ হচ্ছে। কাঠের গাছ, মসলার গাছ এসব গাছ লাগানোর আলাপ-আলোচনা চলছে। এছাড়া যেসব বাগানে সম্ভব সেগুলোতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে বাগানের আয় বাড়ানো যায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাগানের আয় বাড়াতে পারলে শ্রমিকদের মজুরিও ভালোভাবে বাড়াতে পারবো।

মন্ত্রী বলেন, চা বাগানের শ্রমকিদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করছি। যেসব বাগানে স্কুল নেই, সেগুলোতে স্কুল হবে। বাগানের রাস্তাঘাটের সংস্কার করা হবে। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি। এর সুফল আপনারা পাবেন। স্বাস্থ্য-শিক্ষা, মজুরিসহ সবক্ষেত্রেই এর সুফল পাবেন।

সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আব্দুলাহ আল মামুন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ জোসেন চৌধুরীসহ রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।