গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ন্যায়বিচারের নতুন দিগন্ত

প্রকাশঃ Sep 23, 2026 - 19:06
গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ন্যায়বিচারের নতুন দিগন্ত


গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ন্যায়বিচার সুনিশ্চিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

সরকার গঠনের পর বিএনপি দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় আইনসংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। 

এ প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনে পাস হয় শতাধিক আইন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬:

গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিতকরণ, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিকার প্রদানের পাশাপাশি মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়।

২০২৬ সালে পাস হওয়া ১০৭ নম্বর এই আইনে বলা হয়েছে যে, গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তি অন্যূন তিন বৎসর বা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অনধিক পঞ্চাশ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। আর যদি গুমের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে বা গুম হওয়া ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় অথবা গুমের ঘটনার পাঁচ বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তাকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তা হলে উক্তরূপ গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্যূন পাঁচ বৎসর কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অনধিক মাসের  এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

এছাড়া এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা আদালত এই আইনের অধীন আরোপিত অর্থদণ্ডকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে গণ্য করবে এবং উক্ত অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের অর্থ ভুক্তভোগীকে প্রদান করবে। দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হতে উক্ত অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়যোগ্য হবে এবং এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত সম্পত্তির ওপর অন্যান্য দাবি অপেক্ষা অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের দাবি প্রাধান্য পাবে। অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের অর্থ দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হতে আদায় করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ভুক্তভোগীকে উহা প্রদানে বাধ্য থাকবে।

আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তির দায় পরিশোধ, তাহার স্বামী বা স্ত্রী বা তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ বা অন্য কোনো যৌক্তিক ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্য গুম হওয়া ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার বা হস্তান্তর করার নিমিত্ত, স্বামী বা স্ত্রী বা তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের কোনো সদস্যের আবেদন অনুসারে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ ব্যয় নির্বাহ করার উদ্দেশ্য সম্পত্তি ব্যবহার বা হস্তান্তরের জন্য গুম সনদ ইস্যুসহ অনুমতি প্রদান করতে পারবে এবং সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে অন্য যে কোনো প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবে।

এছাড়া যে ক্ষেত্রে গুম হওয়া ব্যক্তি অন্যূন পাঁচ বছর ধরে গুম থাকেন এবং জীবিত ফিরে না আসেন, সেক্ষেত্রে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত গুম হওয়া ব্যক্তির যে কোনো বৈধ উত্তরাধিকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিদ্যমান সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারগণের মধ্যে বণ্টনযোগ্য মর্মে ঘোষণা প্রদান এবং গুম সনদ প্রদান করতে পারবে।

এদিকে পাস হওয়া আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিজে অথবা সরকারের সমর্থন, অনুমোদন বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার, আটক বা অপহরণের পর তার স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করলে বা অবস্থান গোপন করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে আমরা কিছু মৌলিক জায়গায় হাত দিয়েছি। তার একটি হলো গুমের শিকার পরিবার যেন তার সম্পত্তির ভাগ পায়। এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে দরখাস্ত দিয়ে ক্ষেত্রমত তারা সে প্রতিকার পাবেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, গুমের দুইটা সেকশন আছে। একটা আইসিটিতে (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) যাবে। যেটা সিস্টেমেটিক এন্ড ওয়াইড স্প্রেড গুম। আর যেটা অর্ডিনারি কোর্সে গুম হবে ২৪ ঘন্টার বেশি কাউকে অবৈধভাবে আটকে রাখলে, সেটা যাবে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে। 

গুম চিরতরে বন্ধ হবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা মনে করি এবং বিশ্বাস করি বাংলাদেশে গুম চিরতরে বন্ধ হবে। যেমন আপনারা দেখেছেন আমাদের এই সময়ে কোন গুম হয়নি।'

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬:

২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬' পাস হয়েছে। নতুন আইনে মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সমন জারিসহ দেওয়ানি আদালতের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে।

মানবাধিকার কমিশন আইনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন কোনো ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করাই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ কাজ। ইতোমধ্যে আমি ইউএনডিপির কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভের কাছ থেকে একটা অভিনন্দন বার্তা পেয়েছি শক্তিশালী মানবাধিকার  কমিশন করার জন্য। আমরা চেষ্টা করছি...।’

ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬:

সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তা ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করে 'ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬' পাস করা হয়েছে।  ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নতুন পদ্ধতি এই আইনে যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন।

আলোচিত এই আইনটির বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কেন? ইহজাগতিক কারোর ক্ষমতা নাই ইসলামিক ল' এর ওপর হাত দেওয়ার। আমরা সেখানে হাত দিইনি। আমরা হেবাকে সংরক্ষণ করেছি। আইনের মধ্যে এক্সপ্রেসলি সেটা বলেছি।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে একটা নতুন দিগন্ত আমরা উন্মোচন করলাম। আমরা বলেছি যে এই আইন দ্বারা হেবা কিংবা গিফট বা অন্য কোনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরকে বাধাগ্রস্ত করবে না বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। আমরা এই আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের একটা বিকল্প করোনারি আনছি। কেউ যদি হেবা করতে চায় হেবা করতেই পারবে। সেখানে কোন বাধা নাই। কেউ যদি অন্য আইনে সম্পত্তি ডিল করতে চান সেটা করতে পারবে। সেখানেও কোন বাধা নাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘একটা গ্রুপ এটা নিয়ে পলিটিক্স করার চেষ্টা করছেন। এগুলো সাধারণ মানুষ গ্রহণ করছে না। সাধারণ মানুষ এই আইনটাকে খুব পজিটিভলি দেখছে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০২৬:

মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমরা কঠোর আইন করেছি। এ বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি।আমরা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে মাদক নির্মূলের ব্যবস্থা করছি। পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে ঝিনাইদহ জেলাকে রেখেছি এবং সেখানে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’

এছাড়া আইনের ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করে ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। এই আইন পাসের ফলে একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের আগের মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী বিশেষ শর্ত পূরণ করে সেই ব্যাংকের মালিকানা, সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে না।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। সরকারের প্রথম সাতমাসে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শতাধিক আইনের মধ্যে রয়েছে দেওয়ানি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, বাণিজ্যিক আদালত আইন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, জুয়া প্রতিরোধ আইন।