বাবার ছায়ায় ফ্লাভিও বলসোনারো রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হওয়ার পথে
বাবার নাম ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে ব্রাজিলের ডানপন্থীদের উজ্জীবিত ও পুনর্গঠনে জাইর বলসোনারোর যে উগ্র ও আগ্রাসী রাজনৈতিক ধরণ ভূমিকা রেখেছিল, তা ফ্লাভিওর মধ্যে নেই। ফলে বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচিতি তৈরিতে তাকে কড়া লড়াই করতে হচ্ছে।
৪৫ বছর বয়সী এই সিনেটর জাতীয় পর্যায়ে তেমন পরিচিত ছিলেন না। কারাবন্দি বাবা তাকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করার আগে ফ্লাভিও কখনো বাবার পথে হাঁটার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা জানাননি।
রিও ডি জেনেইরো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও বলসোনারো পরিবারের প্রভাব ফ্লাভিওকে এগিয়ে রাখছে। আগামী ৪ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সঙ্গে তিনি এখন হাড্ডাহাড্ডি টক্করে রয়েছেন।
এক সাক্ষাৎকারে ফ্লাভিও বলসোনারো নিজেকে ‘আরও মধ্যপন্থী বলসোনারো’ হিসেবে দাবি করেন। তবে তিনি বলেন, বাবা সবসময়ই ‘আমার দিকনির্দেশক, আমার আদর্শ’ হয়ে থাকবেন।
রিও ডি জেনেইরোর এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, দেখতে আমি বাবার মতোই। কিন্তু পেলের ছেলের সঙ্গে তো পেলের তুলনা হয় না।’
জাইর বলসোনারোর উসকানিমূলক রাজনৈতিক কৌশল বিতর্কিত হলেও তা ডানপন্থীদের দারুণভাবে চাঙ্গা করেছিল। এই কৌশলেই একসময়ের আইনপ্রণেতা জাইর ২০১৮ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জাইর বলসোনারো এখন গৃহবন্দি। নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও পুরো প্রচারণাজুড়েই রয়েছে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় প্রভাব।
রিওর সমাবেশে ২১ বছর বয়সী আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মার্কো আন্তোনিও দা রোসা বলেন, ‘আমি চাইতাম জাইর ব্যালটে থাকুন। কিন্তু তিনি যেহেতু নেই, তাই আমি ফ্লাভিওর পাশেই আছি।’
রিও ডি জেনেইরো রাজ্যে জন্ম নেওয়া ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক প্রেসিডেন্টের চার ছেলের মধ্যে সবার বড়। বাবার সঙ্গে তাঁর চেহারার মিলও সবচেয়ে বেশি।
নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি রিও শহরের পরিচিত স্বচ্ছন্দ আঞ্চলিক ঢং ও ভাষা ব্যবহার করেন।
তাকে প্রায়ই বিভিন্ন স্লোগান লেখা জিনস ও টি-শার্ট পরে ঘুরতে দেখা যায়। যেমন, আমাজন অরণ্যের ওপর ব্রাজিলের মালিকানা বোঝাতে টি-শার্টে লেখা থাকে, ‘আমাজন আমাদের’। আবার কৃষকদের সমর্থন পেতে লেখা থাকে, ‘কৃষি ব্যবসা দারুণ’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে বাবার দুর্দশা কিংবা পরিবারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের কথিত নিপীড়নের কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়তে বা মেজাজ হারাতেও দেখা যায় তাকে।
আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী ফ্লাভিও মাত্র ২১ বছর বয়সে রিও ডি জেনেইরোর রাজ্য আইনপ্রণেতা এবং ৩৭ বছর বয়সে সিনেটর হন।
দুই মেয়ের বাবা ফ্লাভিও নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ ও পারিবারিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। তার প্রচারণার মূল স্লোগান হলো, ‘বিশ্বাস নিয়ে সাথে থাকুন।’
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জানা যায়, বাবাকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ চলচ্চিত্রের অর্থায়নে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
চলচ্চিত্রটিতে অর্থায়ন করেছিলেন ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভরকারো। বর্তমানে কয়েক মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির মামলায় তিনি কারাগারে আছেন।
ভরকারোর এই মামলায় ব্রাজিলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ফ্লাভিও প্রথমে ভরকারোর সঙ্গে যোগাযোগ বা তার ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণের কথা অস্বীকার করেছিলেন। তবে তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর তিনি দুটির কথাই স্বীকার করতে বাধ্য হন।
এর পাশাপাশি সৎমা ও সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল বলসোনারোর সঙ্গেও পারিবারিক বিরোধে জড়ান তিনি। মিশেল ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিওতে অভিযোগ করেন, ফ্লাভিও তার সঙ্গে ‘অসম্মানজনক ও বাজে ব্যবহার’ করেছেন।
ফ্লাভিও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও মিশেল তার কোনো নির্বাচনী সমাবেশে আর হাজির হননি।
এর আগে রিওর আইনপ্রণেতা থাকাকালে সহযোগীদের বেতনের একটি অংশ কেটে ঘুষ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে। তবে সে মামলাটি পরে খারিজ হয়ে যায়।
এছাড়া রিও ডি জেনেইরোর স্থানীয় অস্ত্রধারী মিলিশিয়া নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ফ্লাভিও বলসোনারো এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের বিতর্কিত নিরাপত্তা নীতির প্রশংসা করেছেন। একই সাথে ব্রাজিলে ‘অনেক অনেক কারাগার’ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
প্রচারণায় তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ঝকঝকে নির্বাচনী বিজ্ঞাপন ব্যবহার করছেন। এসব বিজ্ঞাপনে তাকে পাইলটের পোশাক ও চশমা পরে যুদ্ধবিমান চালাতে দেখা যায়।
একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, তিনি বিমানের জানালা দিয়ে ঝুঁকে নৌকায় থাকা মাদক পাচারকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক থমাস ট্রাউমান বলেন, ‘বাবার তুলনায় তিনি বেশি মিশুক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আদর্শগতভাবে তিনি কট্টর ডানপন্থী নন।’