ঐতিহ্যবাহী পাপরিকা মসলা রক্ষায় লড়ছেন হাঙ্গেরির চাষিরা

প্রকাশঃ Oct 4, 2026 - 22:01
ঐতিহ্যবাহী পাপরিকা মসলা রক্ষায় লড়ছেন হাঙ্গেরির চাষিরা


ভোরের আগেই মাঠে কাজ শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত পরিশ্রম করেছেন কৃষক নিকোলেত্তা পাইশান নাগি ও লাসলো পাইশান। ইউরোপের সবচেয়ে শুষ্ক গ্রীষ্মের মধ্যে তারা হাঙ্গেরির ঐতিহ্যবাহী লাল মরিচের ফসল রক্ষায় কঠিন লড়াই করেছেন।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

তাদের আড়াই হেক্টর বা প্রায় ছয় একর জমির ওপর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন চলে যাওয়ায় জমির বড় একটি অংশে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই গাছের গোড়ার মাটি বারবার আলগা করে আর্দ্রতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তারা। 
এসব লাল মরিচ থেকেই তৈরি হয় মধ্য ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির বিখ্যাত মসলা পাপরিকা।
দক্ষিণ হাঙ্গেরির কালোচা শহরের বার্ষিক মেলায় পরিবারের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সময় ৪৪ বছর বয়সী পাইশান নাগি এএফপিকে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমাদের হয়তো খণ্ডকালীন কাজ নিতে হবে। এত পরিশ্রমে আমরা একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম।’

তবে শেষ পর্যন্ত ফলন নিয়ে তারা নিজেরাই অবাক হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এবারের ফলন আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি ও আরও সুন্দর হয়েছে। এটা সত্যিই এক অলৌকিক ব্যাপার।’

ফসল রক্ষায় তাদের প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত মাঠে কাজ করতে হয়েছে।

এই দম্পতি মনে করেন, তারা এমন একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত, যা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী হাঙ্গেরীয় রান্নায় অপরিহার্য পাপরিকার চাষ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক ছোট উৎপাদক চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালে হাঙ্গেরিতে পাপরিকা চাষের জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ২৯ হেক্টরে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৪১০ হেক্টরে।

হাঙ্গেরির অন্যতম প্রধান মসলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডাচ মালিকানাধীন বিডব্লিউএ কেএফটি-র পরামর্শক রবার্ট ব্রাই বলেন, চীন ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ থেকে আসা সস্তা আমদানি স্থানীয় উৎপাদকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাপরিকা চাষ আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, ‘খরা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন নতুন পোকামাকড় ও রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।’

হাঙ্গেরির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা হাঙ্গারোমেট জানিয়েছে, ১৯০১ সালে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে এবারের গ্রীষ্ম ছিল দেশটির সবচেয়ে শুষ্ক। একই সঙ্গে এটি ছিল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম গ্রীষ্ম।

শ্রমিক সংকটও পাপরিকা চাষিদের জন্য বড় সমস্যা।

মেলায় পাপরিকা বিক্রি করা ৪৪ বছর বয়সী অ্যাগনেস টোথ ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে মরিচ তোলার কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘তখন আমরা ছয় হেক্টর জমিতে পাপরিকা চাষ করতাম। এখন প্রায় তিন হেক্টর করি, কারণ হাতে মরিচ তোলার জন্য পর্যাপ্ত মৌসুমি শ্রমিক পাওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আর একটি পরিবার শুধু এই চাষ করে জীবিকা চালাতে পারে না। সবাই পূর্ণকালীন চাকরি করে। আমি একজন শিক্ষক, আর আমার ভাই একজন দমকলকর্মী।’

হাঙ্গেরির কৃষি ও খাদ্য অর্থনীতি মন্ত্রণালয় এএফপিকে জানিয়েছে, তারা পাপরিকা উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। তবে নতুন কোনো পদক্ষেপ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

গত মাসে হাঙ্গেরির অন্যতম প্রধান পাপরিকা উৎপাদন অঞ্চল কালোচায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক মেলায় চারদিকে ছিল ঐতিহ্যবাহী খাবারের ঘ্রাণ। রান্নার প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দল বড় বড় পাত্রে গরুর মাংসের ঝোল ও মাছের স্যুপে প্রচুর পরিমাণে উজ্জ্বল লাল পাপরিকা মিশিয়ে দিচ্ছিল।

স্থানীয় ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর মালিক ও প্রতিযোগীদের একজন ইমরে জেনি গরুর মাংসের ঝোল নেড়ে বলেন, ‘আমাদের হাঙ্গেরীয়দের কাছে পাপরিকা এক বিস্ময়।’

মেলার বিভিন্ন স্টলে শুকনো লাল মরিচের মালা ঝুলছিল। এসব মরিচই পাপরিকা তৈরির মূল উপাদান। শরৎকালে আশপাশের গ্রামের বাড়িগুলোতে এভাবে শুকনো মরিচ ঝুলিয়ে রাখার দৃশ্য একসময় খুবই সাধারণ ছিল।

আমেরিকা মহাদেশ থেকে আসা মরিচ ষোড়শ শতকে কালোচা ও সেজেদ অঞ্চলের রোদঝলমলে ও উর্বর নদীবিধৌত সমভূমিতে পৌঁছায়।

এই দুই ঐতিহাসিক পাপরিকা উৎপাদন অঞ্চল বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুরক্ষিত উৎস-স্বীকৃতি পেয়েছে।

পাপরিকা উৎপাদনের দুটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুরক্ষিত উৎস মর্যাদা লাভ করেছে।

নৃতাত্ত্বিক ইমরে রোমশিচ বলেন, উনিশ শতকে পোশাক, লোকশিল্প ও অন্যান্য ঐতিহ্যের পাশাপাশি পাপরিকাও হাঙ্গেরীয় জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।

তবে বিশেষজ্ঞ রবার্ট ব্রাইয়ের মতে, আগের তুলনায় এখন তরুণ প্রজন্ম কম ঐতিহ্যবাহী হাঙ্গেরীয় খাবার রান্না করে। তারা এমন খাবার পছন্দ করে, যা ‘দ্রুত ও সহজে তৈরি করা যায়।’