গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন চায় বাংলাদেশ: এ্যানি
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ক্লজসহ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হচ্ছে। বর্তমান চুক্তি শুধু নবায়ন না করে বাংলাদেশ সরকার নতুন বা সংশোধিত চুক্তি চায়। এতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় শুষ্ক মৌসুমের পানি নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘রিথিংকিং ওয়াটার ফিউচারস: ইয়ুথ লিডারশিপ, জাস্টিস অ্যান্ড কো-অপারেশন’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায় আরও দীর্ঘমেয়াদি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ নতুন চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে চায় সরকার।
এ্যানি বলেন, ‘আমাদের নতুন একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং এতে অবশ্যই গ্যারান্টি ক্লজ থাকা বাঞ্ছনীয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকারের নীতি হলো জনগণের স্বার্থ ও দেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনো চুক্তি করা।’
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষর হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হবে।
এ্যানি বলেন, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশাবাদী এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকের ভিত্তিতে ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তিটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হবে ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মতো একটি গ্যারান্টি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।
তিনি বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে এ্যানি বলেন, ‘এই সেমিনারে যেমন আলোচনা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের চুক্তি ১৯৯৬ সালের চুক্তির চেয়েও শক্তিশালী ছিল।’
বর্তমান চুক্তি শুধু মেয়াদ বাড়ানোর পরিবর্তে বাংলাদেশ নতুন একটি চুক্তি চাচ্ছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এ্যানি বলেন, সেমিনারে এ বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যারান্টি ব্যবস্থা সম্বলিত দীর্ঘমেয়াদি একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
জেআরসির কারিগরি দল ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, কারিগরি পর্যায়ের কাজ শেষ হলে অবশিষ্ট বিষয়গুলো মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পানি কূটনীতি সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ, তথ্য বিনিময় এবং আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘পানিকে একটি যৌথ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। এর টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুই দেশই উপকৃত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্ষায় অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট- এই দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও খরা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রচলিত পানি ব্যবস্থাপনার গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে।
এ্যানি বলেন, ‘আমাদের পানি কূটনীতি, অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা, জলবায়ু সহনশীলতা, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ন্যায্য অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো বিকল্প নয়, বরং এটি প্রয়োজনীয়।
জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদের ন্যায্য ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্য বিনিময় এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম।
তিনি আরও বলেন, বন্যা, লবণাক্ততা ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার মতো একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে এমন দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে জোট গড়ে তুলতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘তাই আমাদের পানি কূটনীতি একটি সহজ নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত- পানি নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনাকেও সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের জন্য তিস্তা একটি জটিল মৌসুমি সমস্যা তৈরি করে। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়, আবার বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, তিস্তা প্রকল্পের কারিগরি ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করছে সরকার ।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের খুব দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’
এ্যানি বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করার দিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে একই বছর মূল তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বড় প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ইতোমধ্যে একনেকের অনুমোদন পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে এ প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে বলে সরকার আশা করছে।
সেমিনারে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানি প্রধান অতিথি হিসেবে সেমিনারে অংশ নেন।
সেমিনারে আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের পানি কূটনীতি শক্তিশালী করা, অংশগ্রহণমূলক শাসন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং পানি ব্যবস্থাপনায় তরুণদের নেতৃত্ব ও পানি-ন্যায়বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

