যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন সমাজের সন্ধান
আমরা কি ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে বাস করছি? প্রশ্নটি শোনামাত্র মনে হতে পারে, পৃথিবীর নানা সংঘাতকে একটি বড় নাম দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু নামের চেয়ে জরুরি হলো বাস্তবতা বোঝা। যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান নয়। এর প্রভাব জ্বালানি, বাণিজ্য, তথ্যপ্রবাহ, প্রযুক্তি, খাদ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পৌঁছায়। এই অর্থে “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” কথাটি বর্তমান অস্থিরতার একটি সতর্কতামূলক রূপক হতে পারে। তবে একে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য বলার আগে বুঝতে হবে, বিশ্বযুদ্ধের ধারণা কীভাবে নির্ধারিত হয় এবং বর্তমান সংঘাতগুলো তার সঙ্গে কতটা মেলে।
ইতিহাসে বড় যুদ্ধের সময় মানুষ সব সময় বুঝতে পারেনি যে তারা এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ঘটনাগুলোর পূর্ণ অর্থ অনেক সময় পরে ইতিহাসবিদেরা ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু অতীতের এই অভিজ্ঞতা দিয়ে আজকের প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাতকে বিশ্বযুদ্ধ বলে ঘোষণা করা যায় না। যুদ্ধের বিস্তার, রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ, জোটের ভূমিকা এবং সংঘাতের সামগ্রিক প্রভাব বিচার করেই এমন সংজ্ঞা দিতে হয়। তাই শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে সতর্কতার ভাষা হিসেবে, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়।
তবু বর্তমান উদ্বেগ অমূলক নয়। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা বলেছে, সংঘাতের অভিঘাত জ্বালানি বাজার, আর্থিক পরিস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পড়েছে এবং বৈশিক বাণিজ্য ও সরবরাহে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে, সংকট দীর্ঘ হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বাড়তি চাপে পড়তে পারে।
বিশ্বের পণ্যপ্রবাহ বহু দেশের উৎপাদন, জাহাজ চলাচল, বন্দর, জ্বালানি এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হলে বা কোনো সরবরাহকারী অঞ্চল সংকটে পড়লে প্রভাব অন্য জায়গায়ও ছড়িয়ে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি দেশেই দোকানের তাক খালি হবে বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। ঝুঁকি নির্ভর করে কোন পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, বিকল্প উৎস আছে কি না, দেশটির আমদানি সক্ষমতা কেমন এবং সরকার কতটা প্রস্তুত তার ওপর। যুক্তরাজ্যের ২০২৬ সালের একটি সরকারি পূর্বাভাস প্রতিবেদনে সরবরাহব্যবস্থাকে বহুস্তরবিশিষ্ট ও পরস্পরনির্ভর নেটওয়ার্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে জলবায়ু ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে একে অন্যকে বাড়িয়ে দিতে পারে, তাও তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে প্রস্তুতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের পক্ষে প্রতিটি পণ্য নিজে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। কিন্তু জরুরি পণ্যের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, জ্বালানির বিকল্প বাড়ানো, মজুত ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে আগাম পরিকল্পনা করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা সম্ভব। সংকটের সময়ে কেবল আতঙ্ক ছড়ালে সমাধান আসে না। কোন খাতে দুর্বলতা আছে তা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি নেওয়াই বিচক্ষণতার পরিচয়।
এই অস্থিরতার আরেকটি দিক হলো প্রযুক্তি ও নজরদারি। মানুষের পরিচয়, যাতায়াত, কেনাকাটা, যোগাযোগ এবং অনলাইন আচরণ থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কিছু আচরণগত ধরন শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির সক্ষমতা যতই বাড়ুক, তাকে সর্বজ্ঞ বা সচেতন সত্তা ভাবার কারণ নেই। এটি মানুষের তৈরি ব্যবস্থা, যার ফল নির্ভর করে তথ্যের মান, ব্যবহারের উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রতিষ্ঠান এবং তার ওপর থাকা আইনি নিয়ন্ত্রণের ওপর।
আসল প্রশ্ন তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আছে কি নেই, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে তথ্য সংগ্রহ করছে, কী উদ্দেশ্যে করছে, সিদ্ধান্ত ভুল হলে দায় কার, আর নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার পথ কোথায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ২০২৬ সালে সতর্ক করেছেন যে, জবাবদিহি ও সুরক্ষার অভাবে ডিজিটাল নজরদারি মতপ্রকাশ, গোপনীয়তা এবং নাগরিক পরিসরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁরা প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাধীন তদারকি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ক্ষতির প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ডিজিটাল পরিচয় বা ডিজিটাল মুদ্রা নিজে থেকেই দমনমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে না। এসব ব্যবস্থার ব্যবহার মানুষের জন্য সেবা পাওয়া সহজ করতে পারে। আবার যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির সুযোগও বাড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির মূল্যায়নে তার সুবিধার পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য, তথ্যের গোপনীয়তা, নাগরিকের সম্মতি এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দেখতে হবে। ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিমালাও স্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, মানবিক তদারকি এবং সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেয়।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজের অন্য পরিবর্তনও জড়িয়ে আছে। জাতীয়তাবাদ, ধর্ম এবং প্রযুক্তি অনেক মানুষের পরিচয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশ বা জনগোষ্ঠীর আচরণকে এই তিনটি শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনীতি, ইতিহাস, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, শ্রেণিগত অবস্থান এবং মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও ভূমিকা রাখে। অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ কখনো জাতীয় পরিচয়ে নিরাপত্তা খোঁজে, কখনো ধর্মীয় বিশ্বাসে অর্থ ও আশ্রয় পায়, আবার কখনো প্রযুক্তিতে উন্নতির সম্ভাবনা দেখে। এসব প্রবণতা পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে, আবার সংঘাতেও জড়াতে পারে।
ভবিষ্যতের সমাজ নিয়ে নগররাষ্ট্র, কর্পোরেট পরিচালিত জনপদ বা নেটওয়ার্কভিত্তিক সম্প্রদায়ের নানা ধারণা আলোচনায় এসেছে। এগুলোর কিছু হয়তো নতুন প্রশাসনিক পরীক্ষার পথ দেখাবে। কিন্তু কোনো শহর বা ডিজিটাল সম্প্রদায় কার্যকর হলেই তা সবার জন্য ন্যায়সংগত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সিদ্ধান্ত কে নেবে, বাসিন্দাদের অধিকার কী হবে, কর বা সেবার নিয়ম কে নির্ধারণ করবে, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হলে প্রতিকার কোথায় পাওয়া যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া নতুন কাঠামোর আকর্ষণ অসম্পূর্ণ।
প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামোর আলোচনা আমাদের পরিবার, শিক্ষা এবং শিশুর বিকাশের কথাও মনে করিয়ে দেয়। কোনো ব্যক্তিগত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের শুভাকাঙ্ক্ষী বা নৈতিক পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে, এমন কল্পনা আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু একটি যন্ত্র মানুষের বিবেক, সম্পর্ক কিংবা জীবনের উদ্দেশ্যের বিকল্প নয়। শিশুর সৃজনশীলতা গড়ে ওঠে নিরাপদ সম্পর্ক, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, অভিজ্ঞতা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগের মধ্যে দিয়ে। শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফল বা দক্ষতা মাপার পদ্ধতি নয়। এটি মানুষকে অন্যের অবস্থান বুঝতে, প্রমাণ বিচার করতে এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিতে শেখায়।
বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়বে কি না, আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কী ঘটবে, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এমন ভবিষ্যদ্বাণী মানুষের মনোযোগ টানে, কিন্তু অনিশ্চয়তাকে নিশ্চয়তায় বদলে দেয় না। বরং ইতিহাস দেখায়, সংকটের গতিপথ নির্ভর করে মানুষের সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানের শক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর।
আমাদের করণীয় তাই দুই স্তরে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, তথ্যসুরক্ষা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করতে হবে। সমাজকে একই সঙ্গে এমন পরিবেশ গড়তে হবে যেখানে মানুষ যাচাই ছাড়া আতঙ্ক ছড়াবে না, ভিন্নমতকে শত্রু ভাববে না এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে। পরিবার, পাড়া, বিদ্যালয়, স্থানীয় সংগঠন এবং পেশাজীবী সম্প্রদায় সংকটের সময়ে আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তি হতে পারে।
পৃথিবী অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা মানেই অনিবার্য পতন নয়। যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলে শান্তির কূটনীতি আরও জরুরি হয়। নজরদারির ক্ষমতা বাড়লে নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহিও শক্তিশালী করতে হয়। সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হলে বৈচিত্র্য ও সহযোগিতায় বিনিয়োগ করতে হয়। আর প্রযুক্তি মানুষের সিদ্ধান্তের জায়গা নিতে চাইলে শিক্ষা ও মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বাড়ে। ভবিষ্যৎ কেবল বড় শক্তির হাতে লেখা হয় না। মানুষ কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে বাস করতে চায়, সেই সিদ্ধান্তও ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলে।