স্বপ্নের বাড়ি: বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশঃ Oct 22, 2026 - 22:26
স্বপ্নের বাড়ি: বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন সম্ভাবনা


বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। নদীমাতৃক এই দেশে বন্যা যেমন কৃষিজমিতে পলি এনে উর্বরতা বাড়ায়, তেমনি অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও যোগাযোগব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বন্যার তীব্রতা, অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির মাত্রা যখন বাড়ছে, তখন প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে—প্রতিবার ক্ষতির পর ঘর, রাস্তা ও সেতু পুনর্নির্মাণ করব, নাকি এমন অবকাঠামো তৈরি করব যা বন্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে?

কেন দরকার বন্যাবান্ধব আবাসন?

বন্যার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নদী, চর, হাওর ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশের বন্যার ক্ষতি শুধু পানিতে ঘর ডোবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সুপেয় পানির সংকট তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভেঙে পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ প্লাবিত হয়েছিল; ক্ষয়ক্ষতি ও উৎপাদনহানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি, রাস্তা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক চিত্রও খুব আলাদা নয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্যান্যুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পূর্বাঞ্চলীয় বন্যায় প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরাসরি ভৌত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১.৬৭৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে অবকাঠামোতে ৬৪০ মিলিয়ন এবং আবাসনে ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। ২০২৪ সালের পূর্বাঞ্চলীয় বন্যায় ৭,৭২২ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১,১০১টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে রোগী হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো কিংবা ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া—সবই কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বন্যা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো অঞ্চলকে স্থানীয় অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রায় এক দশক আগে শরীয়তপুরের পদ্মাপাড়ে একটি অভিনব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল—বন্যার সঙ্গে লড়াই না করে যদি বাড়িটিকেই বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়?

শরীয়তপুরের ‘স্বপ্নের বাড়ি’

২০১৭-১৮ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre for Climate Change and Environmental Research (C3ER), University of Dundee এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে শরীয়তপুরে তিনটি ভাসমান বাড়ি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির নাম ছিল Floating Houses: Community-Based Flood Resilience Innovations in Bangladesh (University of Dundee, 2018)।

প্রতিটি বাড়ির নিচে ১৮৯টি প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে পানি বাড়লে বাড়িটি ভেসে উঠতে পারে এবং পানি কমলে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে। বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, মাছ ও মুরগি পালন এবং সবজি উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ এটি শুধু একটি বাড়ি ছিল না; বরং বন্যার মধ্যেও একটি পরিবারের বাসস্থান, খাদ্য ও আয়ের ব্যবস্থা ধরে রাখার একটি সমন্বিত মডেল ছিল (দৈনিক প্রথম আলো, ২০২২)।

প্রাথমিক সাফল্যও ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল, প্রযুক্তিগতভাবে ভাসতে পারা আর সামাজিকভাবে টিকে থাকা এক বিষয় নয়। ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কথা উঠে আসে; দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক প্রথম আলো’র ২০২২ সালের প্রতিবেদনে প্রকল্পটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

সিরাজগঞ্জের উভচর বাড়ি: অন্য প্রযুক্তি, একই প্রশ্ন

শরীয়তপুরের ভাসমান বাড়ির পর সিরাজগঞ্জে আরেকটি ভিন্ন প্রযুক্তির পরীক্ষা করা হয়। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের CORE Bangladesh প্রকল্পের আওতায় তৈরি হয় ‘উভচর বাড়ি’। এটি স্বাভাবিক সময়ে মাটির ওপর থাকে, কিন্তু বন্যার পানি বাড়ির নিচে প্রবেশ করলে buoyancy-এর কারণে বাড়িটি পানির সঙ্গে ওপরে ওঠে এবং পানি কমলে আবার মাটিতে বসে যায়। নোঙরব্যবস্থা বাড়িটিকে ভেসে দূরে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করার কথা। নির্মাণে Expanded Polystyrene বা EPS ব্যবহার করা হয় এবং ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা (দৈনিক প্রথম আলো, ২০২২)।

প্রকৌশলগত ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই উদ্যোগও দেখিয়েছে—একটি প্রযুক্তি তৈরি করাই শেষ কথা নয়। প্রশ্ন হলো, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করবে? স্থানীয় পরিবার কি এটি গ্রহণ করবে? নির্মাণ ও মেরামতের খরচ কি দরিদ্র মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে? বাড়ির নকশা কি কৃষিকাজ, পশুপালন, সামাজিক জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? দুটি প্রকল্পের প্রযুক্তি আলাদা হলেও প্রশ্নটি একই—একটি বাড়ি পানির সঙ্গে ওঠানামা করতে পারলেই কি সেটি টেকসই আবাসন হয়ে যায়?

দুটি প্রকল্পের ব্যর্থতার আসল শিক্ষা

শরীয়তপুর ও সিরাজগঞ্জের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং প্রকৌশলগত সাফল্য আর সামাজিক সাফল্য এক নয়, প্রযুক্তিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে না পারা।

একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারের কাছে বাড়ি মানে শুধু ছাদ ও দেয়াল নয়। এর সঙ্গে উঠান, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, কৃষিজমি, প্রতিবেশী, সামাজিক অনুষ্ঠান ও জীবিকা জড়িত। বাড়ি ভাসতে পারলেও যদি সেখানে কৃষিকাজ করা না যায়, পশুপাখি রাখা না যায়, সামাজিক জীবন চালানো কঠিন হয় কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রযুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই শুধু বাড়ি ভাসলেই হবে না; পুরো জীবনব্যবস্থাকে বন্যার সঙ্গে অভিযোজিত হতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থায়ন দায়িত্বের অস্পষ্টতা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে, কিন্তু স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয় জনগণকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো স্পষ্ট না থাকলে ভালো উদ্ভাবনও পরিত্যক্ত অবকাঠামোয় পরিণত হতে পারে।

এবার প্রয়োজন ‘ভাসমান জীবনব্যবস্থা’

তাহলে কি সমাধান শুধু উঁচু ভিটায় বাড়ি তৈরি করা? একদমই নয়। হাওর, চর, নদীতীর, উপকূল ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধ এলাকায় ঝুঁকি এক নয়; তাই সমাধানও এক হতে পারে না। প্রয়োজন স্থানভিত্তিক climate-resilient settlement planning। কোথাও উঁচু ভিটা, কোথাও উভচর বাড়ি, কোথাও ভাসমান বাড়ি এবং কোথাও বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র—এমন সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে উঁচু জমিতে স্থায়ীভাবে বসতি দেওয়ার চেষ্টা করলে কৃষিজমি কমে গিয়ে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ভাসমান কৃষি। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান কৃষি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে পানির মধ্যেও সবজি উৎপাদন সম্ভব;কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে সবজি উৎপাদনের এই পদ্ধতি বহুদিনের; FAO এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিকে ২০১৫ সালে Globally Important Agricultural Heritage System হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে BRRI ও BINA-এর বন্যা-সহনশীল ধানের জাত—যেমন BRRI dhan51, BRRI dhan52, BRRI dhan79 এবং BINA dhan11—ফসলকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। অর্থাৎ বন্যার পানি শুধু বিপদের উৎস নয়; পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় সেটি খাদ্য ও আয়ের সম্পদও হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা

বিচ্ছিন্ন উদ্ভাবনগুলোকে একটি সমন্বিত নীতির আওতায় আনার ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সমন্বয়কের ভূমিকা নিতে পারে।

প্রথমত, ভাসমান ও উভচর আবাসনকে গবেষণা প্রকল্পের পর্যায় থেকে জাতীয় অভিযোজন নীতির অংশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাওর, চর, নদীতীর, উপকূল ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধ এলাকার জন্য আলাদা আলাদা পাইলট flood-resilient settlement তৈরি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রকল্পে শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা তহবিল, স্থানীয় মালিকানা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করতে হবে। পাঁচ বছর বা দশ বছর পর কে মেরামত করবে—প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই তার উত্তর থাকতে হবে। চতুর্থত, বাড়ির সঙ্গে ভাসমান কৃষি, মাছ, হাঁস-মুরগি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ও বন্যা-সহনশীল বীজ যুক্ত করতে হবে। তাহলে বাড়ি শুধু মানুষকে বাঁচাবে না; বন্যার মধ্যেও আয় ও খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করবে। পঞ্চমত, নতুন সড়ক, সেতু ও জনসেবামূলক অবকাঠামোর নকশাতেও বন্যার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের B-STRONG প্রকল্পেও বন্যাপ্রবণ এলাকায় সড়ক, সেতু, আশ্রয়কেন্দ্র, কৃষি ও পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে একসঙ্গে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্যর্থতা থেকে নতুন শুরু

‘স্বপ্নের বাড়ি’ আজ আর আগের অবস্থায় নেই। কিন্তু তাই বলে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়ে অর্থহীন হয়ে যায়নি। বরং এর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো তার ব্যর্থতার মধ্যেই।

শরীয়তপুর দেখিয়েছে, একটি বাড়ি পানির সঙ্গে ভাসতে পারে। সিরাজগঞ্জ দেখিয়েছে, একটি বাড়ি মাটিতে থেকেও পানির সঙ্গে ওঠানামা করতে পারে। ভাসমান কৃষি দেখিয়েছে, পানির মধ্যেও খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। আর বন্যা-সহনশীল ফসল দেখিয়েছে, কৃষিকেও অভিযোজিত করা যায়। এখন প্রয়োজন এসব উদ্ভাবনকে গবেষণাগার ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে আটকে না রেখে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত নীতিতে নিয়ে আসা।

বন্যাকে আমরা থামাতে পারব না। নদীকেও আমাদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষ কীভাবে বন্যার সঙ্গে নিরাপদে বসবাস করবে, কীভাবে খাদ্য উৎপাদন করবে এবং কীভাবে তার ঘর, জীবিকা ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করবে—সেটি আমাদেরই পরিকল্পনা করতে হবে।

ভবিষ্যতের ‘স্বপ্নের বাড়ি’ তাই শুধু একটি ভাসমান ঘর হবে না। এটি হবে ভাসমান বা উভচর আবাসন, বন্যা-সহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং একটি টেকসই জীবিকা—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অভিযোজনের দর্শন হওয়া উচিত বন্যার বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ নয়; বরং বন্যার সঙ্গে বুদ্ধিমান, নিরাপদ ও টেকসই সহাবস্থান।

লেখক পরিচিতি:

তাসনীম ইসলাম দ্যুতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (BIGM)-এর সহকারী পরিচালক (প্রশাসন)। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে অর্থনীতিতে MSS ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গবেষণা, প্রশাসন, নীতি ও প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপনায় তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

যোগাযোগ:

মোবাইল: ০১৯৭৭৩০৩৪১৫

ই-মেইল: tasneem.dyuti@bigm.edu.bd