ময়মনসিংহের এমপি বাচ্চুর বিরুদ্ধে জমি জবরদখল ও জাল দলিলে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ

প্রকাশঃ Aug 18, 2026 - 16:37
ময়মনসিংহের এমপি বাচ্চুর বিরুদ্ধে জমি জবরদখল ও জাল দলিলে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ


ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি করে জমি জবরদখলের চেষ্টা এবং ওই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার উদ্যোগের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে কথিত জাল দলিল বাতিল, জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ বন্ধ এবং অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে মোঃ ওয়াহাব মিয়া লিখিত বক্তব্য দেন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাশিল মৌজার এসএ খতিয়ান-২০-এর মালিক ছিলেন তাদের দাদা মৃত মদন শেখ। তার মৃত্যুর পর জমিগুলো তাদের বাবা ছফির উদ্দিনের নামে ৩৩৯ নম্বর বিআরএস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়। ওই খতিয়ানে ১৭৮, ২০৬, ২৩৬, ২৩৭, ২৩৯, ২৪১, ২৪৮ ও ২৫১ নম্বর দাগে মোট ২ একর ৯৬ শতাংশ জমি লিপিবদ্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছফির উদ্দিন মৃত্যুকালে দুই স্ত্রী, ছয় ছেলে ও চার মেয়েসহ মোট ১২ জন ওয়ারিশ রেখে যান। তারা জন্মের পর থেকেই ওই জমি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩৩৯ নম্বর খতিয়ানের ২ একর ১৯ শতাংশ জমির খাজনা-খারিজ পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, গত ৮ আগস্ট হঠাৎ স্যুট-টাই পরিহিত একদল লোক তাদের জমি পরিদর্শন ও অডিট করতে আসেন। তাদের পরিচয় জানতে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তিরা প্রিমিয়ার ব্যাংক, ঢাকা বনানী শাখার কর্মকর্তা। পরে তারা জানতে পারেন, এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ওই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া করছেন বলে তাদের অভিযোগ।

এ ঘটনায় জমির ওয়ারিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জমি পরিদর্শনে বাধা দেন এবং প্রতিবাদ জানান। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ব্যাংক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

এরপর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, এসব নথি যাচাই করে তারা জানতে পারেন, ছফির উদ্দিনের ৩৩৯ নম্বর বিআরএস খতিয়ানের কথিত মালিকানার ভিত্তিতে একটি ওয়ারিশান সনদ তৈরি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই ওয়ারিশান সনদের ভিত্তিতে বাশিল মৌজার এসএ খতিয়ান-২০, ছফির উদ্দিনের নামে থাকা বিআরএস খতিয়ান-৩৩৯ এবং ওই খতিয়ানের ২৩৬, ২৩৭, ২৩৯, ২৪১, ২৪৮ ও ২৫১ নম্বর দাগ উল্লেখ করে একটি কথিত জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে। তাদের দাবি, দলিলটির নম্বর ৭৩৫৫/২৪ এবং তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০২৪।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ওই দলিলে ২ একর ১৯ শতাংশ জমি দেখিয়ে পরবর্তীতে তা ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর মালিকানাধীন বলে দাবি করা ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামে নামজারি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। কাঠালি, মেহেরাবাড়ী, বাশিল, ঝালপাজা ও হবিরবাড়ি এলাকায় বন বিভাগ ও সাধারণ মানুষের কয়েকশ বিঘা জমি আত্মীয়-স্বজন এবং সশস্ত্র লোকজনের মাধ্যমে দখলের অভিযোগও করেন তারা।

এছাড়া আন্তর্জাতিক এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের জমি দখলের অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে তোলা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের বাপ-দাদার জমিও একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কথিত ভুয়া ওয়ারিশান সনদ, জাল দলিল ও নামজারির মাধ্যমে দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ও দলিল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়। ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, দলিলের সনাক্তকারী হিসেবে জিয়াদ হোসেন শাকিল, ভেন্ডার সাইফুল আলম খান (সনদ নং-৫২৩২) এবং সাক্ষী হিসেবে কায়সার ও হেলাল উদ্দিনসহ কয়েকজনের মাধ্যমে কথিত জালিয়াতির কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা জমি নিয়ে এ ধরনের দলিল তৈরি ও নামজারি করে ব্যাংকে বন্ধক দেওয়ার উদ্যোগ তাদের পরিবারকে উচ্ছেদ এবং জমি দখলের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।

সংবাদ সম্মেলন থেকে এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত, কথিত জাল দলিল বাতিল, নামজারি বাতিল এবং ওই দলিলের ভিত্তিতে জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে জমি জবরদখল ও জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভুক্তভোগীরা।

তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে মোঃ ওয়াহাব মিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।