সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক আদালতে মুখোমুখি কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড
মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে নিষ্পত্তিতে চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক আদালতে মুখোমুখি হচ্ছে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড। প্রতিবেশী দুই দেশের চলমান বিরোধের মধ্যে এটি সর্বশেষ উত্তেজনার ঘটনা।
ব্যাংকক উপসাগরে যৌথভাবে সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি সম্পদ আহরণের লক্ষ্যে করা একটি চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর নমপেন জাতিসংঘ-সমর্থিত সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু করতে স্থায়ী সালিশি আদালতের (পিসিএ) দ্বারস্থ হয়। সিঙ্গাপুর থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
২০০১ সালের সমঝোতা স্মারকে প্রায় ২৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল ও সম্পদসমৃদ্ধ একটি এলাকার কথা বলা হয়েছে। ওই এলাকার ওপর কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড উভয়েই দাবি করে আসছে।
‘এমওইউ ৪৪’ নামে পরিচিত কাঠামোগত চুক্তিটি বাস্তবায়নে ‘কোনো অগ্রগতি হয়নি’ উল্লেখ করে ব্যাংকক গত মে মাসে একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যায়।
প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল অস্বীকার করেছেন যে, এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে চলমান সীমান্ত সংঘাতের কোনো সম্পর্ক রয়েছে। গত বছর দুই দফা সংঘর্ষে ওই বিরোধ নতুন করে জ্বলে ওঠে। এতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। পরে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
কম্বোডিয়া গত সপ্তাহে বলেছে, ‘থাইল্যান্ড একতরফাভাবে সম্মত দ্বিপক্ষীয় কাঠামো বাতিল করার পর’ তারা সমঝোতা প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় দুই দেশ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের পরস্পর-অতিক্রমকারী সমুদ্রসীমার দাবি নিয়ে আলোচনা করে আসছিল।
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জুনে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘কম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্ব ও সমুদ্রসীমার অধিকার রক্ষার’ জন্যও এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের প্রতিনিধিরা মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে বিশ্বের প্রাচীনতম সালিশি আদালতের কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক আইনের পাঁচ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সমঝোতা প্যানেলের সামনে বক্তব্য দেবেন।
কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রাক সোখোন প্রথম বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর বক্তব্য দেবেন তার থাই প্রতিপক্ষ সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও।
১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পিসিএ বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আন্তঃসরকারি বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা। চুক্তি, বিশেষ সমঝোতা এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (ইউএনক্লস)-এর মতো বিভিন্ন চুক্তির ভিত্তিতে এটি দেশ ও বেসরকারি পক্ষের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করে।
সিঙ্গাপুরে পিসিএর কার্যালয়টি হেগভিত্তিক আদালতটির এশিয়ায় প্রথম কার্যালয়।
কমিশনের সুপারিশ বাধ্যতামূলক নয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে।
-‘দীর্ঘস্থায়ী সমাধান’-
কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড উভয়েই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দেশ দুটির সমুদ্রসীমা নিয়ে মতপার্থক্য শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে কম্বোডিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় এই বৈঠক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’
নমপেন বলেছে, তারা আশা করছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড তাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে মতপার্থক্যের ‘ন্যায্য ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে’ পৌঁছাতে পারবে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য তেল ও গ্যাসের মজুদ অনুসন্ধানের পথও উন্মুক্ত হবে।
থাইল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের দাবির আওতাধীন ওই এলাকায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে ভবিষ্যৎ আয় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ‘সমঝোতা কমিশনের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থন দিতে প্রস্তুত’ এবং জাতীয় স্বার্থ ‘সুরক্ষায়’ তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে একজন বিশ্লেষক বলেছেন, থাইল্যান্ডের চুক্তি থেকে সরে যাওয়া এবং কম্বোডিয়ার সমঝোতা প্রক্রিয়ার মামলা—দুটিই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সাম্প্রতিক সংঘাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
থাইল্যান্ডের মাহিদোল ইউনিভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম জোন্স চলতি বিষয়ভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ লিখেছেন, ‘এটি শক্ত অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ভোটারদের এই বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার উত্তরাধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে।’ ২০০১ সালের সমঝোতা স্মারকটি তার সরকারের সময়ই প্রথম প্রণয়ন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার মামলা হুন মানেতের একটি ‘চতুর রাজনৈতিক পদক্ষেপ’ ছিল বলে জোন্স লিখেছেন।
জোন্স বলেন, ‘স্থল সীমান্তে সামরিক পরাজয়ের পর এবং থাইল্যান্ডের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থেকে’ হুন মানেত এমন একটি আইনি পথ বেছে নিয়েছেন, যা ‘কম খরচে বড় সম্ভাব্য সুফল’ পাওয়ার সুযোগ দেয়।