রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার মোস্তফা জগলুল পাশার, তদন্তের দাবি
জয়নাল আবেদীন
ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক যুবদল মহাসচিব মোস্তফা জাগলুল পাশা মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে তার সঙ্গে ওই ঘটনার যোগসূত্রের অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পাশা বলেন, হামলার সময় তিনি ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য কি না, তা সিসিটিভি ফুটেজ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড এবং আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ করা অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ত্রের মুখে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে। পরে তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনার কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয় বলেও জানা যায়।
এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে অভিযোগ
হামলার পর প্রকাশিত কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাসের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, গাড়িটির ভেতরে কয়েকজন ব্যক্তি ছিলেন এবং তাদের মধ্যে পাশার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মাইক্রোবাসটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে চলাচল করছিল এবং গাড়ির ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা হামলায় অংশ নেওয়া লোকজনকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তবে পাশা এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, হামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সাদা মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থলের কাছে তিনি উপস্থিত ছিলেন—এমন দাবিকেও তিনি ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করেন। নিজের অবস্থান সম্পর্কে পাশার বক্তব্য পাশার দাবি, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক মধ্যরাতে তিনি জানতে পারেন যে ঢাকার সিএমএইচে তার এক খালা মারা গেছেন।
এরপর তিনি স্ত্রী, সন্তান, আরেক খালা এবং মৃত খালার এক স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে পান্থপথ থেকে সিএমএইচের উদ্দেশে রওনা হন। পাশা জানান, সামরিক পুলিশের অনুমতি নিয়ে তারা জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন এবং সিএমএইচে যান। সেখানে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
পরে মরদেহ মর্গে রাখা হয় এবং রাত আনুমানিক ৩টা থেকে ৩টা ১৫ মিনিটের মধ্যে তারা সিএমএইচ থেকে বের হয়ে যান বলে জানান পাশা। তিনি বলেন, তার বক্তব্য শুধু তার নিজের কথার ওপর নির্ভর করে যাচাই করার প্রয়োজন নেই। বরং নথিপত্র ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের মাধ্যমে তার অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব।
এ জন্য তিনি জাহাঙ্গীর গেট ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, সিএমএইচের প্রবেশ ও অবস্থানের রেকর্ড, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তার মোবাইল ফোনের অবস্থান ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য পরীক্ষা করার আহ্বান জানান। সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে প্রশ্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাদা মাইক্রোবাসের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এলেও পাশা প্রশ্ন তুলেছেন—তিনি ওই গাড়ির ভেতরে ছিলেন, এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ কী?
তিনি জানতে চান, এই অভিযোগ কি কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, নাকি সিসিটিভি ফুটেজ, অন্য কোনো ভিডিও প্রমাণ কিংবা তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। পাশা বলেন, তিনি যদি সত্যিই ওই সাদা মাইক্রোবাসে থেকে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ফুটেজ বা অন্যান্য প্রমাণ প্রকাশ করে স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত। আর তিনি যদি সেখানে না থেকে থাকেন, তাহলে কীভাবে তার নাম ওই গাড়ির সঙ্গে যুক্ত হলো, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে তার বক্তব্য কেন প্রকাশিত হয়নি পাশা আরও বলেন, কয়েকটি গণমাধ্যম তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের আগে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল।
তবে পেশাগত ব্যস্ততা এবং পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যুতে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি সময়মতো তাদের জবাব দিতে পারেননি। ফলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য স্থান পায়নি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করেন। তবে কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করা উচিত।
তদন্তে যেসব বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার ও আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। পরে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হামলার আগে লোকজন জড়ো করা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থলে একটি এক্সকাভেটর নিয়ে আসার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যের উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা ও অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন—
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে সাদা মাইক্রোবাসটির অবস্থান ও চলাচল।
গাড়ির ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় কীভাবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং কী ধরনের শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর রাত থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ভোর পর্যন্ত জাহাঙ্গীর গেট, ক্যান্টনমেন্ট ও সিএমএইচের সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রবেশ-বের হওয়ার রেকর্ডে পাশার উপস্থিতি দেখা যায় কি না।
আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ করা মোবাইল ফোনের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য পাশার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে পাশার কোনো সরাসরি যোগাযোগ বা অন্য কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পেয়েছেন কি না।
অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
পাশা বলেন, তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। তিনি শুধু নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করার দাবি জানাচ্ছেন।
তিনি বলেন, তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তাহলে অন্য সবার মতো তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, যদি প্রমাণিত হয় যে ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, তাহলে যারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বা যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের ভুলভাবে জড়ানোর অভিযোগ থাকলে সেগুলোও তদন্ত করার দাবি জানান।
তদন্তই এখন মূল বিষয়
হামলায় সরাসরি কারা অংশ নিয়েছিল, কারা এর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।
একইভাবে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছে সাদা মাইক্রোবাসে পাশার উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগও নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাশার দেওয়া অবস্থান-সংক্রান্ত বক্তব্য এবং তার উল্লেখ করা প্রমাণও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য এবং মামলার নথিপত্র ঘটনার প্রকৃত ধারাবাহিকতা ও সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ মুহূর্তে পাশাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ ও তার পাল্টা বক্তব্য—উভয়ই তদন্তের বিষয় হিসেবে রয়েছে।