বাড়তে থাকা জলবায়ু হুমকিতে ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

প্রকাশঃ Mar 1, 2026 - 18:35
বাড়তে থাকা জলবায়ু হুমকিতে ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

মোঃ সোহাগ মিয়া

বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান এক জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি, যা দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানবিক নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতিকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

শত শত নদী দ্বারা বেষ্টিত বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঝড় এখন আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে, যা মানুষের জীবিকা ব্যাহত করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে রেকর্ডমাত্রার তাপমাত্রা ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়ে উঠছে, যা শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। কৃষকেরা বিশেষভাবে বিপাকে পড়ছেন, কারণ প্রচলিত চাষাবাদের মৌসুম বদলে যাচ্ছে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে অনেক জমি পানির নিচে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে লবণাক্ত পানি মিঠা পানির উৎস ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করায় পানীয় জলের সংকট ও কৃষি উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এতে অনেক উপকূলীয় পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকার উৎস হারিয়ে টিকে থাকার জন্য দেশের ভেতরের অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

শহরাঞ্চলেও চাপ বাড়ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে আবাসন সংকট, যানজট এবং পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সেবার চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

পরিবেশগত অবক্ষয়ও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলাভূমি ও বনভূমি, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। কৃষি, মৎস্য এবং অবকাঠামো খাতে প্রতি বছরই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষক ও দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যার ফলে বৈষম্য বাড়ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্য আরও গভীর হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ার মতো রোগের বিস্তার বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা এসব ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। অভিযোজনমূলক এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছে।

তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ একা এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম হওয়ায় দেশটি জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি জানিয়ে আসছে এবং উন্নত দেশগুলোর কাছে নির্গমন কমানোসহ পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর বাংলাদেশের জন্য দূরবর্তী কোনো হুমকি নয়—এটি ইতোমধ্যেই একটি চলমান ও ক্রমবর্ধমান সংকট। আজ দেশ ও বিশ্ব যে সিদ্ধান্তগুলো নেবে, সেগুলিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে।