দ্রুত নগরায়ণের মধ্যে ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ছে বাংলাদেশে
মোঃ সোহাগ মিয়া
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বাংলাদেশ এখন ক্রমেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটলে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে যেখানে প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ কয়েকটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা প্লেট। এই অবস্থানের কারণে দেশটি ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। ইতিহাসে দেখা যায়, এই অঞ্চলে অতীতেও একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যা ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকির বাস্তবতা তুলে ধরে।
ভূকম্পবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের ভেতর ও আশপাশে বেশ কয়েকটি ফল্ট লাইন চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট এবং চট্টগ্রামের কিছু এলাকা এসব সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক গঠনের কাছাকাছি হওয়ায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত দাউকি ফল্টকে এ অঞ্চলের সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামোর ঘাটতি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো শহরগুলোতে দ্রুত এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে অসংখ্য ভবন নির্মিত হয়েছে, যেগুলোর অনেকই যথাযথ নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। অনেক স্থাপনা পর্যাপ্ত প্রকৌশল তদারকি ছাড়াই নির্মিত হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় ধসে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের ভেতরে বা কাছাকাছি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই রাজধানীতে সংকীর্ণ সড়ক ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি উদ্ধারকাজ ও মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যানজট ও সরু রাস্তা উদ্ধার তৎপরতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
এছাড়া জনসচেতনতা ও প্রস্তুতিও তুলনামূলকভাবে কম। অনেক মানুষ ভূমিকম্পের সময় কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে, সে সম্পর্কে অবগত নন। নিয়মিত মহড়া, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এখনো পর্যাপ্তভাবে বিস্তৃত হয়নি।
জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। যদিও সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে—যেমন জরুরি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণ—তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে আধুনিক সরঞ্জাম, সমন্বয় এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ভবন নির্মাণের মান উন্নত করতে বিল্ডিং কোড ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রস্তুতি জোরদারে কাজ করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এসব নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন। ভবন নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার পুনর্বাসন বা সংস্কার এবং জরুরি সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ যখন দ্রুত উন্নয়ন ও নগরায়ণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং ভূমিকম্প প্রস্তুতিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।