বেসরকারি খাতের বিকাশ: কিউবার অর্থনীতিতে বদলের নতুন অধ্যায়
মুদি দোকান, রেস্তোরাঁ, জ্বালানি থেকে শুরু করে গাড়ির যন্ত্রাংশ, কিউবার দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি খাত এখন ধীরে ধীরে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে, যা দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট অর্থনীতি আর ধরে রাখতে পারছে না। এক সময় কিউবানরা রাষ্ট্রীয় ‘বোদেগা’ (রেশন দোকান) থেকে রেশন কার্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য কিনতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর জ্বালানি অবরোধের ফলে সেই ব্যবস্থা এখন দ্রুত বিলুপ্তির পথে। হাভানা থেকে এএফপি এ কথা জানায়।
হাভানার ভেদাদো এলাকার একটি রাষ্ট্রীয় মুদি দোকানের বারান্দায় বসে অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী হোয়াকিন ভেলাসকেস পাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্ষুদ্র সুপারশপে মানুষের ভিড় দেখছিলেন। পাশাপাশি থাকা দুটি দোকান যেন দুই ভিন্ন কিউবার প্রতিচ্ছবি। একদিকে দ্রুত হারিয়ে যাওয়া সেই কিউবা, যেখানে রাষ্ট্রই নাগরিকের সব প্রয়োজন মেটাত। অন্যদিকে নতুন কিউবা, যেখানে মানুষকে ক্রমেই নিজের প্রয়োজন নিজেকেই মেটাতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় দোকানের তাক প্রায় খালি। কারণ, সরকার আর প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করতে পারছে না, যার মাধ্যমে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে বহু দশক ধরে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হতো।
অন্যদিকে পাশের ‘মিপাইমে’, যা কিউবায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত নাম এবং সাধারণভাবে সব ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, সেখানে চাল, রাম, কেচাপসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের প্রাচুর্য দেখা যায়। জুনে গৃহীত মুক্তবাজারভিত্তিক সংস্কারের ফলে এ ধরনের পণ্যের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এর মূল্যও চড়া। এক লিটার ভোজ্যতেলের দাম তিন মার্কিন ডলার, যা রাষ্ট্রীয় বেতনে চলা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শুধু ওই এক লিটার তেলের দামই ভেলাসকেসের মাসিক পেনশনের প্রায় অর্ধেকের সমান।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, ‘মিপাইমে’ বলে কিছুই নেই।’
দুই কিউবার গল্প
হাভানাজুড়ে ব্যক্তিখাতের ব্যবসা দ্রুত নগরচিত্র বদলে দিচ্ছে। একের পর এক নতুন দোকানে ঠান্ডা বিয়ার, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, গাড়ির যন্ত্রাংশসহ নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে। কিউবায় এখনো বাণিজ্যিক স্থাপনা ব্যবহারের পূর্ণ অনুমতি নেই। তবে সাম্প্রতিক সংস্কারের মাধ্যমে এ সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসা এখন বাড়ি, গ্যারেজ কিংবা রাষ্ট্রীয় দোকানের ভাড়া নেওয়া জায়গা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। সোভিয়েত ধাঁচের যে রাষ্ট্রে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিল্প, কৃষি, রেস্তোরাঁসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং যেখানে বিজ্ঞাপন প্রায় ছিলই না, সেখানে এটি এক আমূল পরিবর্তন।
বাজার অর্থনীতির পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ আসে ২০২১ সালে, যখন সর্বোচ্চ ১০০ জন কর্মী নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা ‘মিপাইমে’ পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। পাঁচ বছর পর সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট খুচরা বিক্রির অর্ধেকেরও বেশি এখন এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে আবাসন উন্নয়ন, ব্যাংকিং, কৃষিসহ নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের সুযোগও খুঁজছে তারা। তবে ‘মিপাইমেরো’, অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের উত্থান, একসময় তুলনামূলক শ্রেণিবৈষম্যহীন কিউবায় নতুন বৈষম্যেরও জন্ম দিয়েছে।
নতুন ধনীরা হাভানার বিখ্যাত সমুদ্রতীরবর্তী মালেকোন বুলেভার্ডে ভগ্নপ্রায় নব্য-ধ্রুপদি ভবনের পাশ দিয়ে এসইউভি গাড়িতে চলাফেরা করছেন। অন্যদিকে বিদেশে আত্মীয়স্বজন না থাকায় যারা ডলার পান না কিংবা অনলাইনে খাবার আনানোর সুযোগ নেই, তাদের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদেরই একজন ৬২ বছর বয়সী রসায়নবিদ মারিৎসা গোমেস।
তিনি বলেন, ‘কোনো না কোনো সময়ে সাধারণ কিউবানদের জন্য আরও কার্যকর সমাধান বের করতেই হবে।’
‘টিকে থাকাই এখন লক্ষ্য’
যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধ আরোপ করার পাশাপাশি দীর্ঘ ছয় দশকের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে আরও নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করেছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে কিউবার ব্যক্তিখাতকে সমর্থনের কথাও বলছে। গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিউবার ব্যক্তিখাতের আমদানি পাঁচ গুণ বেড়েছে। তবে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, কখনো টানা ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত, এবং প্রতি লিটার জ্বালানির দাম আট ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় ব্যবসাগুলোও চাপে পড়েছে।
পশ্চিম হাভানার কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন মুদি দোকান ও ফাস্টফুড আউটলেটের ব্যবস্থাপক ৪১ বছর বয়সী হুয়ান কার্লোস ব্লেইন বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান এখন কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছে। বড় প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগ তৈরি হলেও তিনি বলেন, ‘আমরা সম্প্রসারণের কথা ভাবছি না, শুধু টিকে থাকার কথাই ভাবছি।’ হাভানার ৩২ বছর বয়সী স্ক্রিন প্রিন্টিং ব্যবসায়ী কামিলা আরিয়েতা বলেন, একসময় তার প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টি-শার্ট ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করত। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যবসা করতে গিয়ে নানা বাধার সঙ্গে লড়াই করতে করতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তবু এখন ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভাবছেন। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কার্লোস এনরিকে গনসালেস মনে করেন, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দ্রুত ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি দেখে যে ঘোষিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, তাহলে তারা আবার আস্থা ফিরে পাবে।’