যশোরে এমপির বাড়িতে হামলায় বিএনপির মদদের অভিযোগ জামায়াতের
মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলায় বিএনপির নেতা–কর্মীদের মদদ আছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত। এর প্রতিবাদে জামায়াতের নেতা–কর্মীরা আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যশোর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
গোলাম রসুল যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির। তাঁর বাসভবন যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায়। তাঁর বাড়ির সামনে আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদ আছে। আজ বেলা ১১টার দিকে গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে বিরোধে জড়ান।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সংসদ সদস্য ও তাঁর মেয়ে বাসভবনের মূল ফটক বন্ধ করে ভেতরে চলে যান। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাঁদের বাসভবন ভাঙচুর করেন।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, বিক্ষোভকারী, জামায়াতে ইসলাম ও বিএনপি নেতা–কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। পুলিশ সুপার জানান, আগামীকাল বুধবার বেলা তিনটায় জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে মাদ্রাসার অভিভাবক, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংসদ সদস্য গোলাম রসুলকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
আজ সন্ধ্যায় সরেজমিন দেখা যায়, বাড়ির প্রধান ফটকে তালা। জানালার গ্লাস ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙা। বাসভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতরেই ছিলেন; কেউ বের হননি।
সংসদ সদস্যের বাসায় হামলার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির নেতা–কর্মীদের মদদে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিতভাবে সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসায় একদল সন্ত্রাসী ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িত ও উসকানিদাতাদের অবিলম্বে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানান তিনি।
ওই বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘দুর্বৃত্তায়ন কিংবা ‘মব’ করে জামায়াতকে বিতর্কিত করতে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব টার্গেটেড অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত। ঘটনার সত্যতা তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ এবং নাগরিকদের বিভ্রান্ত না করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।’
হামলার প্রতিবাদে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন জামায়াতের নেতা–কর্মীরা। এটি শহরের সিভিল কোর্ট মোড় থেকে শুরু হয়ে দড়াটানা মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকী, সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, প্রচার সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহবুদ্দিন বিশ্বাস, শহর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ইসমাইল হোসেন প্রমুখ।
এদিকে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন (খোকন)। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা–কর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। বরং স্থানীয় নারীরা যখন মহাসড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন, তখন আমাদের নেতা–কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়, মানুষের চলাচলে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেটা দেখার জন্য। এ ছাড়া আমাদের নেতা–কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, যাতে কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হয়।’
যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় যশোর-নড়াইল মহাসড়কের পাশে প্রফেসর পাড়া গড়ে উঠেছে। ওই পাড়ায় প্রবেশের জন্য ৮–১০ ফুট চওড়া একটি গলিপথ রয়েছে। সেখানে সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাড়ির বিপরীতে ২০২৩ সালে আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ নামে একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গোলাম রসুলের বাড়ির সামনে আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদ আছে। ওই মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমপির পরিবারের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরোধ চলছিল। সংসদ সদস্যের মেয়ে অনন্যা সোমবার মাদ্রাসার কয়েক শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখান। এ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে পুলিশের মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়। আজ বেলা ১১টার দিকে সংসদ সদস্য ও তাঁর মেয়ে মাদ্রাসায় গেলে অভিভাবকদের সঙ্গে আবার বিরোধে জড়ান। এর পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা এমপির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান।
সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের ভাই তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আবাসিক এলাকার মধ্যে ছোট্ট একটি জায়গায় একটি কওমি মাদ্রাসা করা হয়েছে। ওই মাদ্রাসায় যাতায়াতের পথটি অত্যন্ত সরু। সব সময়ই রাস্তাটিতে মাদ্রাসার অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ভিড় থাকে। এটা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকবার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। যে কারণে বিরোধটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। আতঙ্কের কারণে ভাইয়ের বাড়ি থেকে কেউ বের হতে পারছে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার প্রধান মুফতি কবির হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাড়ে ৮ শতক জমির ওপর মসজিদ ও মাদ্রাসা করা হয়েছে। টিফিনের সময় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে খেলাধুলা করে। অভিভাবকেরাও রাস্তার ওপর কিছু সময় থাকে। এমপি সাহেবের মেয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের গায়ে পানি মেরেছেন, মারধরও করেছেন। এসব কারণে সবাই ক্ষুব্ধ ছিলেন।’