ইরানের পরমাণু কর্মসূচির চেয়ে তেলের দাম কমানোই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার এখন আর দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নয়। বরং মার্কিন ভোক্তাদের জন্য পেট্রোলের দাম কমানোই এখন প্রধান লক্ষ্য। বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ কথা বলেছেন। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেহরানকে চাপে ফেলতে নতুন অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শিগগিরই আসছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের এসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তেহরান কতটা শক্তিশালী দর-কষাকষির ক্ষমতা অর্জন করেছে। ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেছেন, এখন সেই লক্ষ্য পেছনে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার অবাধে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার।
ভ্যান্সের মন্তব্যে যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি সরবরাহের পথটি উন্মুক্ত ছিল।
প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার পেয়ে গেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের হামলা চালানো থেকে পিছিয়ে থাকছেন।
ফক্স নিউজকে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি জানি আজ তেলের দাম কমেছে এবং সংঘাতের শুরুর দিকের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এটি অনেকটাই কম। আমাদের এক নম্বর লক্ষ্য হলো-দেশজুড়ে আমেরিকানদের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম সস্তা রাখা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ অবশ্যই দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে- সেটি নিশ্চিত করা।’
-‘নিম্ন মাত্রায় রাখছি’-
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা সামরিক অভিযানের ব্যাপারে প্রশাসনের সবচেয়ে সন্দিহান সদস্যদের একজন ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
তবে তাঁর এসব মন্তব্যে এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পছন্দের আরও সতর্ক অবস্থানেরই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থানের আওতায় ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দর অবরোধ এবং তেল বিক্রি ঠেকানো।
আরও অর্থনৈতিক শাস্তির ঘোষণা দিয়ে বেসেন্ট ইরানকে ‘বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি এমন’ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মাত্র কয়েক দিন আগেও ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি চুক্তি হওয়া আসন্ন। কিন্তু এখন তার প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা স্থগিত রয়েছে। কারণ ট্রাম্প আশা করছেন, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ইরানকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে।
ট্রাম্প রোববার বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিম্ন মাত্রায় রাখছি। আমরা তাদের সঙ্গে কেবল আংশিকভাবে আলোচনা করছি। আমরা শুধু দেখছি, ইরানে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি হচ্ছে এবং তারা বেশ অর্থ সংকটে আছে।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস পরিবেশিত খবরে বলা হচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিপুল অর্থ ব্যয়ে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রের মজুত ব্যবহার করেছে এবং এখন এসব অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। ফলে ইরানের ওপর আবার হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়ছে।
ভ্যান্স আরও বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা জ্বালানি নিয়ে বেশি মনোযোগ দিই। কারণ আমরা চাই আমেরিকানরা যেন তেল ও গ্যাসের দাম বহন করতে পারে। আবার কখনো আমরা অবশ্যই সামরিক বিষয়, পরমাণু কর্মসূচির দিকে মনোযোগ দিই।’
সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা হলে তবেই তিনি ইরানে আবার হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবেন।
এখন প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য ইরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এসব শর্ত মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
এসব শর্ত জুনে স্বাক্ষরিত কথিত সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ায় ওই সমঝোতা ভেস্তে যায়। এতে ইরানের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিল গঠনের একটি বিধানও ছিল।
এসব শর্ত জুনে সম্পাদিত তথাকথিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর ওই সমঝোতা ভেঙে যায়। এতে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল গঠনের একটি প্রস্তাবও ছিল।