উৎসবকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাঃ ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত ফুলের অর্থনীতি
বাংলাদেশে উৎসব মানেই ফুলের সমারোহ। আর দুর্গোৎসব মানেই ফুলের অপরিহার্য ব্যবহার। মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে সনাতনধর্মীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। দেবীর পূজা, মণ্ডপসজ্জা, অঞ্জলি কিংবা অতিথি বরণ—সবখানেই ফুলের উপস্থিতি উৎসবকে দেয় আলাদা সৌন্দর্য। শুধু দুর্গাপূজা নয়, বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আচার এবং বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক দিবসেও ফুলের ব্যবহার আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু উৎসবের আনন্দ শেষে সেই ফুলগুলোর বড় অংশের জায়গা হয় ময়লার ভাগাড়ে।
অথচ যে ফুল কিছুক্ষণ আগেও ছিল ভক্তি, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের প্রতীক, সময়োচিত পদক্ষেপে যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা গেলে সেই ফুলই বর্জ্যের পরিবর্তে হয়ে উঠতে পারে নতুন পণ্যের কাঁচামাল, কিছু পরিবারের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস। সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ আমাদের প্রতিবেশী ভারতেই রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বিদ্যমান উদাহরণ
এ ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফুলের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে শিব অর্পণ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীরা ব্যবহৃত ফুল থেকে ধূপকাঠি ও পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করছেন। ২০২৪ সালে ভারতের Press Information Bureau-র তথ্যানুযায়ী, ভারতে Phool নামের একটি সামাজিক উদ্যোগ মন্দির ও অন্যান্য স্থান থেকে ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ করে সেগুলোকে ধূপকাঠি এবং অন্যান্য পণ্যে রূপান্তর করছে।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন শহর থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২১ টন floral waste সংগ্রহ করে এবং এসব ফুল পুনর্ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছে; এই প্রক্রিয়ায় নারীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের আরেকটি উদাহরণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিন কয়েক টন ফুল ও অন্যান্য বর্জ্য তৈরি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে এ উদ্যোগের মাধ্যমে তিন কোটির বেশি ধূপকাঠি ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হয়েছিল। UNESCO-3 Phool-এর উদ্যোগকে পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নারীর কর্মসংস্থানের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পর ফেলে দেওয়া ফুলও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
কেন ভাবব
প্রথমত, ফুল একটি পচনশীল পণ্য হলেও তা সম্পূর্ণভাবে একবার ব্যবহারযোগ্য নয়। ফুলের পাপড়ি, সুগন্ধি ও জৈব উপাদানকে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও floral waste থেকে incense তৈরির সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন flower-powder ও binding material-এর সমন্বয়ে কার্যকর formulation পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অস্থায়ী কর্মসংস্থান। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবের কয়েক সপ্তাহকে কেন্দ্র করে ফুল সংগ্রহ, বাছাই, শুকানো, গুঁড়ো করা, মণ্ড তৈরি, ধূপকাঠি তৈরি, প্যাকেটজাতকরণ ও বিক্রয়ের একটি ছোট supply chain গড়ে তোলা সম্ভব।
তৃতীয়ত, এখানে নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। ফুল ধোয়া, বাছাই, শুকানো, গুঁড়ো করা, মণ্ড তৈরি এবং কাঠি তৈরির মতো কাজ প্রশিক্ষণ দিয়ে বাড়িভিত্তিক বা ছোট কর্মশালায় করা সম্ভব। ভারতের অভিজ্ঞতায় ফুল পুনর্ব্যবহারভিত্তিক উদ্যোগে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গেছে।
চতুর্থত, এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ফুলের বাজারও ছোট নয়। একটি গবেষণায় দেশের বাণিজ্যিক ফুলচাষের পরিমাণ প্রায় ৬,০০০ হেক্টর এবং floriculture sector-এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ফুলের বাজার সারা বছরই সক্রিয়। যশোরের গদখালী-পানিসারা অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান ফুল উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র; ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল সেখানে ফুলের প্রধান মৌসুম। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে ৬ হাজারের বেশি কৃষক ফুল চাষ করেন। তাঁদের উৎপাদিত ফুল দেশের বিভিন্ন জেলায়
সরবরাহ করা হয়। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের এই বড় ব্যবস্থায় মান যাচাইয়ে বাদ পড়া ফুল, অবিক্রীত ফুল এবং বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়া ফুলের একটি অংশ আলাদাভাবে সংগ্রহ করা গেলে তা এই শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে পুনর্ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে ফুল উৎপাদন এলাকা, ফুলের বাজার, মন্দির-পূজামণ্ডপ, অনুষ্ঠানস্থল এবং স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে যুক্ত করে একটি floral waste value chain গড়ে তোলা যেতে পারে।
অধিকন্তু, বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হতে পারে ফুল সংগ্রহের উৎস। অনুষ্ঠান শেষে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহৃত ফুল আলাদাভাবে সংগ্রহ করা যেতে পারে। ভালোবাসা দিবস, বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ইদ, পহেলা বৈশাখ, বর্ষাবরণ, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, শহিদ বুদ্ধিজীবি দিবস, বিজয় দিবস, –বিভিন্ন উপলক্ষে ফুলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ঢাকার শাহবাগের ফুলের বাজারের চিত্রও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই ফুলের বাজার জাতীয় ও সাংস্কৃতিক দিবসগুলোতে বড় ধরনের বিক্রির কেন্দ্র হয়ে ওঠে; ২০২৫ সালের পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বাজারটির প্রায় ১০০টি দোকানে মোট ৫০ লাখ টাকার ফুল বিক্রির প্রত্যাশা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকা ট্রিবিউন-এর ২০২৫সালের প্রতিভেদন থেকে জানা যায় স্বাভাবিক সময়ে প্রতি দোকানে দৈনিক গড় বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ।
নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা
এখানে সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষের সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ঋণ সহায়তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনগুলো ফুল আলাদাভাবে সংগ্রহ ও পরিবহন, পরিবেশ অধিদপ্তর পণ্যের পরিবেশগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নির্গমন পরীক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি নির্দেশনা প্রদান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং floriculture-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন অঞ্চল ও বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। পিকেএসএফ-এর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে floriculture-কে নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ইতোমধ্যেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখানে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাজটির কিছু অংশ বাড়িতে বসেও করা সম্ভব। ফলে ঘরের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিম্নআয়ের নারী বা গৃহিণীদের জন্য এটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ফুলের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মতো উদ্যোগ শুধু পরিবেশগত সুফলই তৈরি করে না, নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। ‘ফুল থেকে তৈরি’ বা ‘প্রাকৃতিক' হলেই কোনো ধূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিহীন—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। ধূপ পোড়ানোর ফলে ঘরের বাতাসে particulate matter বা সূক্ষ্ম কণা তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালে ঘরের বায়ুদূষণে সূক্ষ্ম কণার স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ধূপ পোড়ানোর সঙ্গে indoor air pollution-এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরু থেকেই পণ্যের মান, উপকরণের নিরাপত্তা, ধোঁয়া ও নির্গমন পরীক্ষা এবং ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। আশার কথা হলো, ফুলের বর্জ্য থেকে তুলনামূলক কম- ধোঁয়াযুক্ত ধূপ তৈরির প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ভারতের CSIR-CIMAP ফুল ও পাতার বর্জ্য থেকে ধূপকাঠি ও ধূপকোন তৈরির একটি প্রক্রিয়া তৈরি করেছে এবং সেটিকে low-smoke formulation হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এটি হয়তো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটাবে না। জাতীয় বর্জ্য সমস্যারও সমাধান করবে না। কিন্তু অর্থনীতির প্রতিটি পরিবর্তন বড় আকারে শুরু হয় না। কখনও কখনও একটি ছোট ধারণা মানুষের আচরণ বদলায়, একটি নতুন value chain তৈরি করে এবং একটি নতুন জীবিকার দরজা খুলে দেয়।দেবীর পায়ে অর্পিত ফুল যদি দিনের শেষে ডাস্টবিনে না গিয়ে কোনো নিম্নআয়ের পরিবারের আয়ের উৎস হয়, তবে সেটি শুধু বর্জ্য পুনর্ব্যবহার নয়- এটি অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কল্যাণকে একই সুতোয় বাঁধার একটি ছোট প্রয়াস। আর হয়তো ফুলের সেই দ্বিতীয় জীবন থেকেই জন্ম নিতে পারে বাংলাদেশের একটি ছোট, সুগন্ধি এবং পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্প।
লেখক পরিচিতি:
তাসনীম ইসলাম দ্যুতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (BIGM)-এর সহকারী পরিচালক (প্রশাসন)। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে অর্থনীতিতে MSS ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গবেষণা, প্ৰশাসন,
নীতি ও প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপনায় তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
যোগাযোগ:
মোবাইল: ০১৯77303415
ই-মেইল: tasneem.dyuti@bigm.edu.bd

