দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে জ্বালানি নিরাপত্তার বড় পরিকল্পনা
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
দেশীয় গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বনির্ভর, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
একই সঙ্গে দেশীয় খনিজ সম্পদের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০ খাতের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রাখা হয়েছে। এ খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ১.৮৫ শতাংশ।
সরকারের মতে, শিল্পোৎপাদনসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, পতিত সরকারের আমলে অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং ক্যাপাসিটি চার্জনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে এ খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কিছু বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও মেগা প্রকল্পে একতরফা শর্তের ফলে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা প্রয়োজন সাপেক্ষে আধুনিকায়ন, সর্বনিম্ন ব্যয়ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে স্মার্ট গ্রিড উন্নয়ন এবং এসসিএডিএ, জিআইএস ও এএমআই প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানো ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
দুর্গম ও দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি মহানগর এলাকায় বিতরণ লাইন ও সাবস্টেশন ভূগর্ভস্থ করার কাজও এগিয়ে চলছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যুতের ট্যারিফ যৌক্তিক রাখা যায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে রুফটপ সোলার কর্মসূচি সম্প্রসারণ, উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ সমীক্ষা, বৃহৎ সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, জাতীয় এনার্জি স্টোরেজ রোডম্যাপ এবং গ্রিড ফ্লেক্সিবিলিটি কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিতে জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উৎসাহিত করতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সোলার, উইন্ড ও ব্যাটারি প্ল্যান্টের যন্ত্রাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার পাশাপাশি ৯ হাজার ১৫৪ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ ও আধুনিকায়ন এবং ৯০০ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যা থেকে এ বছরের আগস্ট নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট এবং আগামী বছরের জানুয়ারি নাগাদ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার নতুন করে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করছে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ আকর্ষণীয় করতে মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) সংশোধন করা হয়েছে। অগভীর সমুদ্রে ৯টি এবং গভীর সমুদ্রে ১৫টি ব্লক আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্র উভয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) মাধ্যমে ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ মেয়াদে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক জরিপ এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক জরিপ সম্পন্নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ দিয়ে ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপের ওয়ার্কওভার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন রিগ কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল এক্সপ্লোরেশন’ কর্মসূচির আওতায় অফশোর গ্যাস ও আনকনভেনশনাল হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয়-সাশ্রয়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য কৌশলগত জ্বালানি মজুত (এসইআর) ও সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে মাতারবাড়িতে ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তেল শোধন সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম অথবা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি স্থাপনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২ হাজার ৭২২টি ট্যাংকলরিতে স্মার্ট ফুয়েল ডিস্ট্রিবিউশন মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশীয় খনিজ সম্পদের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা এবং ১৪ লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দ্বিতীয় ফেইজ এবং দিঘীপাড়া কোল ফিল্ড প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া যমুনা নদী ও মেঘনা নদীর বালিতে জিরকন ও মোনাজাইটসহ মূল্যবান খনিজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ চলছে।
গ্যাসের অপচয়, অবৈধ সংযোগ এবং সিস্টেম লস কমাতে প্রি-পেইড মিটারের ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিকাশে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া গ্রাহকসেবা সহজ করতে নতুন সংযোগ ও বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াকে অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের জন্য সর্বোত্তম জ্বালানি মিশ্রণ নির্ধারণে ‘পাওয়ার সেক্টর স্ট্র্যাটেজি পেপার (২০২৬-২০৫০)’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মোতাবেক দেশীয় শিল্প সুরক্ষার লক্ষ্যে ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়লা আমদানিতে শুল্ক-কর রেয়াত সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনায় একদিকে যেমন দেশীয় গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে।