জলবায়ু কার্যক্রমে পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান: জাতিসংঘ
জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থ, নীতি এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত পরিকল্পনায় পানিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। তারা বলছে যে, যদি আমরা নিরাপদ পানি, শৌচাগার এবং জলসম্পদের যত্ন না নিই, তবে আমরা কার্যকরভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে পারব না। পানির যত্ন না নিলে তা খাদ্য, স্বাস্থ্য, শক্তি, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের ক্ষেত্রেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং একটি উন্নত বিশ্বের জন্য বড় লক্ষ্য অর্জনেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বার্তায় বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট মূলত একটি "পানি সংকট" হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। কারণ পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের অধিকাংশ প্রভাব পানির মাধ্যমেই মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও আকস্মিক বন্যা, আবার কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির উৎস হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তীব্র খরা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, পানীয় জলের সরবরাহ, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, এসব সমস্যা মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনাকে জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই কোনো না কোনোভাবে পানি-সম্পর্কিত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং জলাভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখনো শত কোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র, উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্থাটি বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। এতে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে কৃষিজমিতে সেচ সংকট দেখা দেয়, খাদ্য উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে পানি সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, এটি অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে।
জাতিসংঘ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ পানি অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলাধার সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং খরা মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী এবং তরুণদের পানি ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জাতিসংঘের এই আহ্বান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলে খরা, মধ্যাঞ্চলে নদীভাঙন এবং বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা দেশের পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পানি সম্পদের সুরক্ষা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
পরিবেশবিদদের মতে, পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি মানবজীবন, কৃষি, শিল্প, জ্বালানি উৎপাদন এবং অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তাই জলবায়ু নীতিতে পানিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে।
জাতিসংঘ বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, জলবায়ু সম্মেলন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন বাজেটে পানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জলবায়ু অর্থায়নের মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থাটির মতে, "জলবায়ু কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পানি" এই নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।