প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ভালো’ বৈঠক: জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মঙ্গলবার জানান, হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ভালো বৈঠক’ হয়েছে। তিনি বলেন, বৈঠকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লাইসেন্স ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার উপায় নিয়ে কথা হয়েছে।
এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। এমন সময় এই আলোচনা হলো, যখন কিয়েভ ও মস্কো দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে এবং যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে আছে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
বৈঠকের পর এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেন, ‘ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা একসঙ্গে যা করছি, তার জন্য সবকিছুর প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
তিনি বলেন, ‘প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লাইসেন্স এবং সহায়ক হতে পারে এমন আরও কয়েকটি ধারণা নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা কূটনীতি নিয়েও কথা বলেছি। কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বৈঠকটিকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের হামলা যুদ্ধের অবসানে সহায়ক হতে পারে।
বৈঠকের আগে ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, কিয়েভের প্রধান অগ্রাধিকার হলো নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্র সরবরাহ এবং চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করা।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া কঠিনভাবে প্রতিহত করা যায় এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর ফলে গত মাসটি ছিল এপ্রিল ২০২২-এর পর ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস।
ইউক্রেনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়াশিংটনের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের একটি প্যাকেজ কেনার অনুমোদন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
৭১ বছর বয়সে চলতি মাসে আকস্মিকভাবে মারা যাওয়া রিপাবলিকান সিনেটর ও ইউক্রেনের দৃঢ় সমর্থক লিন্ডসে গ্রাহামের স্মরণসভায়ও জেলেনস্কির অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
জেলেনস্কি বলেন, গ্রাহামের মৃত্যুর জন্য তিনি ট্রাম্পকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি গ্রাহামকে ‘ইউক্রেনের প্রকৃত বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন।
-‘অসাধারণ কাজ’-
গত বছর ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেন। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র কেনার অনুমতি দেন।
তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে রয়েছে। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগে ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সুবিধা দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে দুই নেতার তীব্র বাকবিতণ্ডার পর তাদের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। ওই সময় ট্রাম্প জেলেনস্কির বিরুদ্ধে অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ আনেন এবং তাকে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন’ বলে মন্তব্য করেন।
চলতি মাসে তুরস্কে সর্বশেষ বৈঠকে ট্রাম্প জেলেনস্কির ‘অসাধারণ কাজের’ প্রশংসা করেন এবং কিয়েভকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার তালিকায় ইউক্রেন আলোচনা পিছিয়ে পড়ার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে জেলেনস্কি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেন।
রাশিয়ার দাবি করা ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিয়ে মতবিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আগের মধ্যস্থতার উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়।
-নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ-
হোয়াইট হাউসের বৈঠক ও গ্রাহামের স্মরণসভা শেষে জেলেনস্কি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত দ্বিদলীয় বিলের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগত ভোটের আগে সিনেটরদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
গ্রাহাম এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিলের পক্ষে কাজ করেছেন। মৃত্যুর অল্প আগে তিনি সংশোধনী নিয়ে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন।
কিছু ডেমোক্র্যাট উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, বিলের কিছু ধারা রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপে ট্রাম্পের ক্ষমতা বাড়াবে।
তবে, দ্বিদলীয় ভোটে বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পথে এগিয়ে যায়। এতে প্রতিনিধি পরিষদের ওপর চাপ বাড়ে, যেখানে বিলটি নিয়ে আরও বেশি মতভেদ রয়েছে।
এদিকে, গত বছরের আগস্টে আলাস্কায় ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাাদিমির পুতিনের বৈঠকের পর মস্কো ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক শীতল হয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের হামলা বৃদ্ধি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল ডিপো, শোধনাগার ও জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার ওপর হামলা জোরদার করেছে। এতে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলেনস্কির ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে কিয়েভ রাশিয়ার দিকে কয়েক শত ড্রোন পাঠায়। অন্যদিকে, মস্কো গত রাতে ইউক্রেনের ওপর শতাধিক ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে ওডেসা বন্দর এবং ইউক্রেনের কৃষিপণ্য বহনকারী জাহাজেও হামলা অব্যাহত রাখে।