গাজীপুরে কারখানায় অভিযান, ৫০ লাখ নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট ধ্বংস
সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোলের অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা উদঘাটন করেছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাজীপুরের একটি সিগারেট কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের Virgo Tobacco Ltd.-এর কারখানা ও তৎসংলগ্ন একটি গুদামে অভিযান চালায় মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, ঢাকার প্রিভেন্টিভ টিমের দুটি দল। অভিযানে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দলিলপত্র, ব্যবহৃত স্ট্যাম্প/ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
অভিযানকারী কর্মকর্তারা জানান, কারখানায় অভিযান চালানোর সময় বাইরে থেকে গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বারবার গেট খোলার জন্য বলা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে গোয়েন্দা দলের সদস্যরা দেয়াল টপকে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা সিগারেট উৎপাদনের কার্যক্রম চলতে দেখেন।
কারখানা চত্বরে ধোঁয়া দেখতে পেয়ে সেখানে গিয়ে কর্মকর্তারা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল এবং নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলার দৃশ্য দেখতে পান। পোড়ানো সিগারেট ও ব্যান্ডরোল ধ্বংসের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দেখাতে বলা হলে সংশ্লিষ্টরা তা উপস্থাপন করতে পারেননি। এ ধরনের ধ্বংস কার্যক্রমের জন্য বিভাগীয় কর্মকর্তার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে জানানো হয়।
মূসক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার লিখিত বিবৃতিতে আনুমানিক ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে গোয়েন্দা দল পোড়া ব্যান্ডরোলের অবশিষ্টাংশ আলামত হিসেবে জব্দ করে।
অভিযানকালে কারখানা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুদাম এবং আবাসিক ভবনে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সেখানে কিছু বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেটের নমুনা ও খালি প্যাকেটও পাওয়া যায়। এসব সামগ্রীর বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ফাঁকির একটি কৌশলও সামনে এসেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বৈধ স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে গোপনে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল।
অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। মূসক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের আইটি ও সাইবার ফরেনসিক টিম মোবাইল ফোনগুলোর চ্যাট হিস্ট্রি, বিক্রয়-সংক্রান্ত গোপন বার্তা এবং হিসাবের ছবি বিশ্লেষণ করে। এসব তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কারখানাটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদিত সিগারেটের একটি বড় অংশ কোনো ভ্যাট চালান বা মূসক-৬.৩ ছাড়াই বাজারে সরবরাহ করে আসছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এসব লেনদেন ও বিক্রির তথ্য প্রতিষ্ঠানের মূল হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল। উদ্ধার করা পণ্য, জব্দকৃত আলামত এবং ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উদঘাটিত হয়েছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী দায়ের করা মামলাটির নম্বর ১৭/২০২৬ এবং তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা, তামাকজাত পণ্যের অবৈধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রতিরোধ এবং জাল স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে দেশব্যাপী অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর, ঢাকা-এর অভিযান ও কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।