আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস: ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবিতে বিশ্ব

প্রকাশঃ Aug 30, 2025 - 17:26
আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস: ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবিতে বিশ্ব


প্রতি বছর ৩০শে আগস্ট, সারা বিশ্বের মানুষ ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করে এবং তাদের প্রতি সমর্থন জানায়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো এই ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি তাদের সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং সত্য, ন্যায়বিচার ও দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানায়।

জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক গুম এমন একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বা তাদের মদদপুষ্ট কোনো গোষ্ঠী কাউকে আটক বা অপহরণ করার পর তার অবস্থান, ভাগ্য কিংবা আটক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে। এর ফলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি আইনের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোরপূর্বক গুম কেবল একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ নয়; এটি একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে বছরের পর বছর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, ফলে স্বজনরা আশা ও হতাশার মধ্যেই দিন কাটান। এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী বলে বিবেচনা করে।

দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্তায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো পরিস্থিতিতেই জোরপূর্বক গুম গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসবাদ দমন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া যায় না। তিনি সকল রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং স্বৈরশাসনের সময় জোরপূর্বক গুমের বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে পরিবারগুলো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অনেক দেশে এখনো গুমের পুরোনো ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়নি এবং নতুন অভিযোগও সামনে আসছে।

জাতিসংঘের Committee on Enforced Disappearances (CED) এবং Working Group on Enforced or Involuntary Disappearances (WGEID) বিশ্বব্যাপী গুমের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, তদন্তে সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এসব সংস্থা রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান, কার্যকর জাতীয় আইন প্রণয়ন এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গুমের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিতকরণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর না হলে জোরপূর্বক গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা কঠিন হবে বলেও তারা সতর্ক করেছে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গুম দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, মানববন্ধন, স্মরণ অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা। এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত আরও শক্তিশালী করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলেই জোরপূর্বক গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক গুম দিবস তাই কেবল স্মরণ নয়, বরং মানবাধিকার সুরক্ষা, সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।